৩ জানুয়ারি ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানকে শুধু একটি অবৈধ শক্তি প্রয়োগ হিসেবে দেখলে পূর্ণ চিত্র ধরা পড়ে না। বিশ্লেষকদের মতে, এটি এমন এক ভূরাজনৈতিক ধারার অংশ, যেখানে আন্তর্জাতিক আইনকে উপেক্ষা করে বৈশ্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় সাম্রাজ্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গি প্রাধান্য পাচ্ছে। এর মাধ্যমে শুধু ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্বই ক্ষুণ্ন হয়নি, বরং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ওপর আস্থাও গভীরভাবে নড়বড়ে হয়ে গেছে।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অভিযান রাষ্ট্রসংঘ সনদের মূল নীতির স্পষ্ট লঙ্ঘন। সনদের বিধান অনুযায়ী, কোনো রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অখণ্ডতা বা রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ নিষিদ্ধ, কেবল আত্মরক্ষার ক্ষেত্রে সীমিত ব্যতিক্রম রয়েছে। ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে সেই ব্যতিক্রম প্রযোজ্য নয় বলে মত তাদের। দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা, প্রকাশ্য হুমকি এবং সাম্প্রতিক সামরিক পদক্ষেপের ধারাবাহিকতায় এই হামলা আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অভিযানের পর সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হয়ে ওঠে ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপ্রধান নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নেওয়ার ঘটনা। অনেকের মতে, এটি রাষ্ট্রপ্রধানের দায়মুক্তি নীতিরও লঙ্ঘন। যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ নেতৃত্ব প্রকাশ্যে দাবি করে যে, ভেনেজুয়েলার শাসন ও নীতিনির্ধারণ এখন তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে, যতক্ষণ না দেশটি তথাকথিত স্থিতিশীলতায় পৌঁছায়। এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়।
প্রথমদিকে ধারণা করা হচ্ছিল, যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদোকে ক্ষমতায় বসানোই ছিল অভিযানের মূল লক্ষ্য। তবে শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার ধারাবাহিকতায় উপ-রাষ্ট্রপ্রধান ডেলসি রোদ্রিগেজের উত্থান সেই ধারণাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে। বিশ্লেষকদের মতে, অভ্যন্তরীণ সমর্থন ও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে সমঝোতার সম্ভাবনাই এই সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে।
এই প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক আইন ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতাও নতুন করে সামনে এসেছে। রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের ভেটো ক্ষমতা কার্যত জবাবদিহিকে অকার্যকর করে রেখেছে বলে মত অনেকের। ফলে শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো ইচ্ছামতো পদক্ষেপ নিতে পারছে, আর আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভেনেজুয়েলা ইস্যু আন্তর্জাতিক আইনের সম্পূর্ণ পতনের চেয়ে বরং শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর সচেতন উপেক্ষার দৃষ্টান্ত। একই ধরনের প্রবণতা আগে ইউক্রেন যুদ্ধের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে। এতে স্পষ্ট হচ্ছে, বৈশ্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় বর্তমান কাঠামো কার্যকর নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলপত্রেও এই দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন রয়েছে বলে বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন। সেখানে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বদলে একক প্রাধান্য ও সম্পদ নিয়ন্ত্রণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। লাতিন আমেরিকাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে অঞ্চলটিকে নিজেদের প্রভাবক্ষেত্র হিসেবে পুনর্নির্ধারণের ইঙ্গিতও রয়েছে।
ভেনেজুয়েলা অভিযান তাই শুধু একটি দেশের ওপর হামলা নয়, বরং আন্তর্জাতিক আইন, রাষ্ট্রসংঘের ভূমিকা এবং বৈশ্বিক শক্তি ভারসাম্য নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলেছে। অনেকের আশঙ্কা, এই ধারা অব্যাহত থাকলে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠবে এবং ভবিষ্যতে নতুন সংঘাতের ঝুঁকি বাড়বে।
















