দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার এক বছর পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর প্রতিশ্রুতি দেন। ২০২৪ সালে পণ্য ও সেবায় যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি ছিল প্রায় ৯১৮ বিলিয়ন ডলার, যা মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৩.১ শতাংশ। এই ঘাটতি কমাতে আন্তর্জাতিক জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইন ব্যবহার করে তিনি ‘পারস্পরিক শুল্ক’ আরোপের ঘোষণা দেন, যা এপ্রিল থেকে কার্যকর হয়।
তবে সাম্প্রতিক বাণিজ্য তথ্য বলছে, ট্রাম্প প্রশাসনের প্রত্যাশা অনুযায়ী চীন থেকে আমদানি কমলেও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও তাইওয়ানের ক্ষেত্রে চিত্র ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতারা চীনের বদলে এসব অঞ্চল থেকেই পণ্য সংগ্রহ করছে, ফলে সরবরাহ শৃঙ্খল নতুনভাবে সাজানো হচ্ছে, কিন্তু মোট বাণিজ্য নির্ভরতা কমছে না।
বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, এক জায়গায় চাপ দিলে পণ্য অন্য উৎস থেকে আসবেই। ফলে শুল্কের কারণে বাণিজ্য বন্ধ না হয়ে বরং নতুন পথে সরে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাণিজ্য এ কারণে বেড়েছে।
চীনের রপ্তানি কমেছে
ট্রাম্প প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য ছিল চীন। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে পাল্টাপাল্টি শুল্ক আরোপের ফলে ২০২৫ সালের নভেম্বর নাগাদ চীনা পণ্যের ওপর গড়ে প্রায় ৪৭.৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়। এর প্রভাবে ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে চীনের রপ্তানির মূল্য প্রায় ২০ শতাংশ কমে যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে চীন থেকে আমদানি ছিল প্রায় ৪৩৯ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৫ সালে নেমে আসে প্রায় ২৬৬ বিলিয়ন ডলারে। একই সঙ্গে সামগ্রিক পণ্য বাণিজ্য ঘাটতিও কমেছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার লাভ
চীনের বিকল্প হিসেবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ শৃঙ্খলে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। শুরুতে এসব দেশের ওপর ১৭ থেকে ৪৯ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের কথা বলা হলেও পরে আলোচনার মাধ্যমে তা কমিয়ে প্রায় ১৯ থেকে ২০ শতাংশে আনা হয়।
এই শুল্ক থাকা সত্ত্বেও ২০২৫ সালে থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য বাণিজ্য বেড়েছে। ইন্দোনেশিয়ার ক্ষেত্রে বাণিজ্য ঘাটতি ১১ শতাংশ, থাইল্যান্ডের ক্ষেত্রে ২৩ শতাংশ এবং ফিলিপাইনের ক্ষেত্রে প্রায় ৩৮ শতাংশ বেড়েছে। ভিয়েতনামের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি সবচেয়ে বেশি বেড়েছে, প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার।
বিশ্লেষকদের মতে, কিছু ক্ষেত্রে চীনা পণ্য দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করছে, তবে মূল কারণ হচ্ছে সরবরাহ শৃঙ্খলের কাঠামোগত পরিবর্তন। চীন থেকে যন্ত্রপাতি ও মধ্যবর্তী পণ্য আমদানি করে সেগুলো ব্যবহার করে এসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য চূড়ান্ত পণ্য তৈরি করছে।
তাইওয়ানের সঙ্গে বাণিজ্যও বাড়ছে
চীনের বাইরে পূর্ব এশিয়ায় তাইওয়ানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৪ সালে যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাইওয়ানের বাণিজ্য ঘাটতি ছিল প্রায় ৭৩.৭ বিলিয়ন ডলার, ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১১১.৮ বিলিয়ন ডলারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সেমিকন্ডাক্টর খাতে ব্যাপক চাহিদাই এই বৃদ্ধির মূল কারণ। শুল্ক ছাড় ও আংশিক অব্যাহতির ফলে তাইওয়ানের চিপ ও সংশ্লিষ্ট পণ্যের রপ্তানি দ্রুত বেড়েছে। একই কারণে ভিয়েতনামও যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বড় চিপ সরবরাহকারীতে পরিণত হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসন একদিকে বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে চাইলেও অন্যদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও শেয়ারবাজারের উত্থান ধরে রাখতে আগ্রহী। ফলে কিছু ক্ষেত্রে শুল্ক নীতি ও অর্থনৈতিক লক্ষ্য পরস্পরবিরোধী হয়ে উঠছে।
আগামীর চিত্র
ট্রাম্পের ‘পারস্পরিক শুল্ক’ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টে আইনি চ্যালেঞ্জ চলছে। আদালতের রায় যাই হোক, এসব শুল্ক পুরোপুরি প্রত্যাহার হতে সময় লাগবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। একই সঙ্গে চলতি বছরের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন ও মূল্যস্ফীতির চাপ শুল্ক নীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আপাতত শুল্ক নীতির কারণে বৈশ্বিক বাণিজ্য কমেনি, বরং চীন থেকে সরে এসে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও তাইওয়ান নতুন করে লাভবান হচ্ছে।
















