পাকিস্তানের বৃহত্তম শহর করাচিতে একটি শপিং সেন্টারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ২৩ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় শহরটির ভবন নিরাপত্তা, উদ্ধার সক্ষমতা ও নগর ব্যবস্থাপনা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। নিহতদের মধ্যে একজন অগ্নিনির্বাপক কর্মীও রয়েছেন। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন বহু মানুষ।
গত শনিবার রাতে করাচির সাদ্দার এলাকার গুল প্লাজায় আগুন লাগে। তিনতলা এই বাণিজ্যিক ভবনে প্রায় ১ হাজার ২০০ দোকান ছিল, যেখানে গয়না, গৃহস্থালি সামগ্রী, কার্পেট, ব্যাগ ও ক্রোকারিজসহ নানা পণ্য বিক্রি হতো। আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে ফায়ার সার্ভিসের ২৪ ঘণ্টারও বেশি সময় লেগে যায়। এ সময় ভবনের একাধিক অংশ ধসে পড়ে, যা উদ্ধারকাজকে আরও জটিল করে তোলে।
করাচি সিটি করপোরেশনের মেয়র মুর্তাজা ওয়াহাব জানিয়েছেন, অগ্নিকাণ্ডের কারণ ও দায় নির্ধারণে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করা হবে। তিনি বলেন, আগুন নেভানোর পরও ঠান্ডা করার সময় বারবার আগুন জ্বলে ওঠায় উদ্ধারকাজে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। তাঁর মতে, এখনো অন্তত ৬০ জন নিখোঁজ রয়েছেন এবং অনুসন্ধান কার্যক্রম চলছে। সিন্ধ প্রাদেশিক সরকার নিহত প্রত্যেকের পরিবারকে এক কোটি রুপি করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
এখনো আগুন লাগার সুনির্দিষ্ট কারণ নিশ্চিত করা যায়নি। প্রাথমিকভাবে পুলিশের ধারণা, বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত চূড়ান্তভাবে কিছু বলা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
উদ্ধারকর্মীরা জানিয়েছেন, সরু রাস্তা, উৎসুক জনতার ভিড় এবং ভবনের ভেতরে থাকা দাহ্য সামগ্রী উদ্ধারকাজকে অত্যন্ত কঠিন করে তুলেছে। বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিকজাত পণ্য থাকায় আগুন বারবার নতুন করে ছড়িয়ে পড়ে। নিচতলার মানুষজন একাধিক প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ ব্যবহার করে পালাতে পারলেও ওপরের তলায় আটকে পড়া অনেকেই বের হতে পারেননি।
এই অগ্নিকাণ্ডকে ২০১২ সালের বালদিয়া পোশাক কারখানার আগুনের পর করাচির সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। সেই ঘটনায় ২৫০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। নগর বিশেষজ্ঞদের মতে, করাচির প্রায় ৭০ শতাংশ ভবনেই পর্যাপ্ত অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই। শুধু ২০২৩ ও ২০২৪ সালেই শহরটিতে ২ হাজার ৫০০টির বেশি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।
নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, বারবার এমন দুর্ঘটনা প্রমাণ করে যে করাচিতে ভবন কোড বাস্তবায়ন, নিয়মিত পরিদর্শন, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম ও জরুরি প্রশিক্ষণের ঘাটতি রয়েছে। ২ কোটির বেশি মানুষের এই শহরে মাত্র ৩৫টি ফায়ার স্টেশন এবং সীমিত সংখ্যক ফায়ার ইঞ্জিন ও মই গাড়ি রয়েছে, যা বড় ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলায় অপ্রতুল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গুল প্লাজা তুলনামূলকভাবে অন্যান্য ভবনের চেয়ে ভালো নকশার হলেও এত প্রাণহানি হলে শহরের বাকি ভবনগুলোর অবস্থা আরও উদ্বেগজনক। তাঁরা সতর্ক করে বলেছেন, কার্যকর সংস্কার ও জবাবদিহি না হলে ভবিষ্যতে আরও বড় বিপর্যয়ের আশঙ্কা থেকেই যাবে।
অনেকে আশা করছেন, গুল প্লাজার এই মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ড অন্তত এবার প্রশাসনকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করবে, যাতে ভবিষ্যতে এমন ট্র্যাজেডি আর না ঘটে।
















