জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডের কড়া সমালোচনা করে বলেছেন, ওয়াশিংটন আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা না করে ক্ষমতার দাপট দেখাচ্ছে। ভেনেজুয়েলা ও গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে মার্কিন হস্তক্ষেপের কথা উল্লেখ করে তিনি সতর্ক করেন যে, জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠাকালীন নীতিগুলো এখন চরম হুমকির মুখে।
আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা না করে যুক্তরাষ্ট্র ক্রমাগত ‘দায়মুক্তির’ সঙ্গে আচরণ করছে এবং দেশটি মনে করে তাদের সামরিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা আন্তর্জাতিক আইনের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে এমন বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। আজ সোমবার (১৯ জানুয়ারি) বিবিসি রেডিও ৪-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি ওয়াশিংটনের একপাক্ষিক নীতির কড়া সমালোচনা করেন।
গুতেরেস বলেন, ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে একটি স্পষ্ট বিশ্বাস কাজ করছে যে, বহুপাক্ষিক সমাধান এখন অপ্রাসঙ্গিক। তিনি আরও বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এখন একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তাদের ক্ষমতা ও প্রভাবের প্রয়োগ। কখনও কখনও সেই প্রয়োগ আন্তর্জাতিক আইনের মানদণ্ডকে সম্পূর্ণ পাশ কাটিয়ে করা হচ্ছে।” ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হামলা চালিয়ে প্রেসিডেন্টকে আটক এবং ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড দখলের জন্য ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক হুমকির প্রেক্ষাপটে গুতেরেস এই মন্তব্য করেন। তাঁর মতে, জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌমত্ব ও সমতার নীতি এখন খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই জাতিসংঘের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে আসছেন। গত বছরের সাধারণ অধিবেশনেও তিনি সংস্থাটিকে অপ্রয়োজনীয় বলে অভিহিত করেছিলেন। ট্রাম্পের এমন কঠোর অবস্থানের মুখে গুতেরেস স্বীকার করেন যে, জাতিসংঘ সনদ মেনে চলতে সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে বাধ্য করার ক্ষমতা তাঁর সংস্থার নেই। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “কিছু মানুষ মনে করে আইনের শক্তির জায়গায় এখন ‘ক্ষমতার আইন’ বসানো উচিত। বর্তমান নিরাপত্তা পরিষদ আর বিশ্বকে যথাযথভাবে প্রতিনিধিত্ব করে না এবং এটি এখন প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে।”
গুতেরেস বিশেষ করে নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী পাঁচ সদস্যের ‘ভেটো’ ক্ষমতার অপব্যবহারের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ই নিজেদের স্বার্থে এই ক্ষমতা ব্যবহার করে ইউক্রেন, গাজা এবং ভেনেজুয়েলার মতো বড় সংকটগুলোর আন্তর্জাতিক সমাধান ব্যাহত করেছে। তাঁর মতে, ১৯৪৫ সালের সেকেলে সমাধান পদ্ধতি দিয়ে ২০২৬ সালের জটিল ভূ-রাজনৈতিক সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়। উল্লেখ্য, গুতেরেস ২০১৭ সাল থেকে জাতিসংঘের নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং চলতি বছরের শেষেই তাঁর এই দায়িত্ব ছাড়ার কথা রয়েছে।
ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকায় যখন যুদ্ধ ও অস্থিতিশীলতা বাড়ছে, তখন গুতেরেসের এই মন্তব্য বৈশ্বিক রাজনীতিতে নতুন বিতর্ক উসকে দিয়েছে। বহুপাক্ষিক বিশ্ব ব্যবস্থার মৃত্যু এবং আন্তর্জাতিক আইনের শাসন রক্ষায় বিশ্বনেতাদের নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে গুতেরেস বলেন, “সত্য হলো, যদি আমরা শক্তিশালীদের চ্যালেঞ্জ না করি, তবে কখনোই আমরা একটি ভালো বিশ্ব গড়ে তুলতে পারব না।”
















