জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে সাহস, ত্যাগ ও মানবিকতায় উজ্জ্বল বাংলাদেশের নাম
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর দীর্ঘ চার দশকের অবদান বিশ্ব শান্তি ও মানবতা রক্ষায় এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
‘সমরে আমরা শান্তিতে আমরা, সর্বত্র আমরা, দেশের তরে’—এই দীপ্ত চেতনা বুকে ধারণ করে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে জন্ম নেয় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। সময়ের পরিক্রমায় এই বাহিনী কেবল দেশের প্রতিরক্ষা শক্তি নয়, বরং জাতির আশা, আস্থা ও গর্বের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। যুদ্ধ, দুর্যোগ কিংবা জাতীয় সংকট—প্রতিটি ক্ষেত্রেই জনগণের পাশে নির্ভীকভাবে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।
দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো নির্মাণ ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে সেনাবাহিনীর অবদান অনস্বীকার্য। প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষা বিস্তার, জরুরি চিকিৎসাসেবা প্রদান এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় তাদের পেশাদারিত্ব দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সুদৃঢ় একতা ও শৃঙ্খলাবদ্ধ কাঠামো কেবল দেশেই নয়, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও প্রশংসিত। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে তাদের সাহসী ও মানবিক ভূমিকা বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের মর্যাদা বৃদ্ধি করেছে।

২০২৫ সালের ২৮ নভেম্বর জাতিসংঘ তাদের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের ভূয়সী প্রশংসা জানায়। সেখানে উল্লেখ করা হয়, বিশ্বজুড়ে সাতটি শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের পাঁচ হাজার ছয় শতাধিক সামরিক ও পুলিশ সদস্য ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে দায়িত্ব পালন করছেন এবং শান্তি রক্ষায় অনন্য ত্যাগ স্বীকার করছেন।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের সূচনা হয় ১৯৮৮ সালে ইরান–ইরাক সামরিক পর্যবেক্ষণ মিশনের মাধ্যমে। পরবর্তীতে নামিবিয়া, কম্বোডিয়া, রুয়ান্ডা, সোমালিয়া, বসনিয়া, কঙ্গোসহ বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা সাহসিকতা ও পেশাদারত্বের অনন্য নজির স্থাপন করেন।
এ পর্যন্ত বাংলাদেশ সেনাবাহিনী চারটি মহাদেশের ৪০টি ভিন্ন এলাকায় ৫৬টি জাতিসংঘ শান্তি মিশনে অংশ নিয়েছে। এই দীর্ঘ যাত্রায় এক লাখ ৯৪ হাজারের বেশি শান্তিরক্ষী দায়িত্ব পালন করেছেন। পাশাপাশি তিন হাজারেরও বেশি নারী শান্তিরক্ষী অংশগ্রহণ করে নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।

শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে দক্ষতা বাড়াতে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস সাপোর্ট অপারেশন ট্রেনিং (বিপসট) আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ প্রদান করছে, যা বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে দায়িত্ব পালনে সক্ষম করে তুলেছে।
বর্তমানে কঙ্গো, মালি, সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক, দক্ষিণ সুদান, লেবানন ও পশ্চিম সাহারাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা শান্তি প্রতিষ্ঠায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন।
এই দীর্ঘ চার দশকে শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ থেকে ১৬৮ জন শান্তিরক্ষী শহীদ হয়েছেন। তাঁদের আত্মত্যাগ বিশ্ব শান্তির ইতিহাসে বাংলাদেশের অবদানকে আরও মহিমান্বিত করেছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বিবিসি এক সময় বাংলাদেশকে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা বাহিনীর ‘মেরুদণ্ড’ হিসেবে উল্লেখ করে।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী শুধু যুদ্ধবিদ্যায় প্রশিক্ষিত বাহিনী নয়, এটি মানবিক মূল্যবোধে উজ্জীবিত একটি সুশৃঙ্খল প্রতিষ্ঠান। পেশাদারিত্ব, সাহস ও মানবতার সমন্বয়ে তারা বিশ্ব শান্তি রক্ষায় যে ভূমিকা রেখে চলেছে, তা বাংলাদেশের জন্য গর্বের এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা।
















