বাংলাদেশের তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং বিএনপির দীর্ঘকালীন চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার স্মরণে রাজধানী ঢাকার জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় এক বিশাল নাগরিক শোকসভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। শুক্রবার বিকেলে আয়োজিত এই সভায় দেশের বিশিষ্ট নাগরিক, রাজনীতিবিদ, কূটনীতিক এবং বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষ অংশ নিয়ে তাঁর বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন ও অবদানের কথা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন। বক্তারা তাঁকে সাহস, দেশপ্রেম এবং নীতিনিষ্ঠার এক জীবন্ত প্রতীক হিসেবে অভিহিত করেছেন।
শোকসভায় তারেক রহমান ও বিশিষ্টজনদের উপস্থিতি
নাগরিক শোকসভায় অংশ নেন খালেদা জিয়ার জ্যেষ্ঠ পুত্র ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান, পুত্রবধূ ডা. জুবাইদা রহমান এবং নাতনি ব্যারিস্টার জাইমা রহমান। মঞ্চের সামনে দর্শকসারিতে তাঁদের পাশে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্যবৃন্দ। দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশের মাটিতে ফিরেই তারেক রহমান তাঁর মায়ের এই নাগরিক স্মরণসভায় যোগ দিলেন।
শোককে শক্তিতে রূপান্তরের ডাক
প্রবীণ সাংবাদিক শফিক রেহমান তাঁর বক্তব্যে বেগম জিয়ার সাহস ও দেশপ্রেমের প্রশংসা করে বলেন, “এই শোককে শক্তিতে রূপান্তর করতে হবে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ভোট দেওয়ার মাধ্যমে। কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনার কারণে বা সহিংসতার ভয়ে নির্বাচনের আশা নষ্ট হতে দেওয়া যাবে না।” তিনি ভোটারদের উদ্দেশে প্রার্থীদের কাছ থেকে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা আদায়ের আহ্বান জানান।
আদর্শিক ও অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় অবদান
বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও আয়োজক কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ বেগম জিয়ার তিনটি অমর উক্তি স্মরণ করেন, যা তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের প্রতিফলন:
- “দেশের বাইরে আমাদের বন্ধু আছে, প্রভু নেই।”
- “আমাদের হাতে স্বাধীনতার পতাকা, ওদের হাতে বন্দীর শৃঙ্খল।”
- “দেশই আমার শেষ ঠিকানা।”
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এবং ট্রান্সকম গ্রুপের সিইও সিমিন রহমান বাংলাদেশের অর্থনীতিতে খালেদা জিয়ার অবদান তুলে ধরেন। সিমিন রহমান বলেন, “নব্বইয়ের দশকে বাজারমুখী নীতির মাধ্যমে তিনি বেসরকারি খাত ও বিনিয়োগে গতি এনেছিলেন। ভ্যাট পলিসি, সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন এবং ওষুধ নীতি তাঁর সরকারের সুদূরপ্রসারী সংস্কারের ফল।”
মার্জিত নেতৃত্ব ও সহনশীলতার দৃষ্টান্ত
ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম এবং নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবীর খালেদা জিয়ার মার্জিত নেতৃত্ব ও সহনশীলতার প্রশংসা করেন। তারা উল্লেখ করেন যে, রাজনৈতিক জীবনে চরম প্রতিকূলতা ও কারাবাস সত্ত্বেও তিনি কখনো প্রতিহিংসামূলক আচরণ করেননি। স্বাধীন সাংবাদিকতার প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা এবং সমালোচনা গ্রহণের সক্ষমতা দেশের রাজনীতিতে বিরল বলে মন্তব্য করেন তারা।
তদন্তের দাবি ও আইনি পর্যবেক্ষণ
খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসক অধ্যাপক এফ এম সিদ্দিকী অভিযোগ করেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর চিকিৎসায় ইচ্ছাকৃত অবহেলা করা হয়েছিল, যা তাঁকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। তিনি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটির মাধ্যমে এর বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করেন। সভার সভাপতি ও সাবেক প্রধান বিচারপতি জে আর মোদাচ্ছির হোসেন বলেন, খালেদা জিয়া ধ্বংস নয় বরং ভালোবাসা ও শান্তির সমাজ গড়ার কথা বলতেন।
শোকসভাটি সংসদ ভবন এলাকায় সেনাবাহিনী, বিজিবি ও পুলিশের কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনীতে সম্পন্ন হয়। দোয়া ও মোনাজাতের মাধ্যমে শেষ হওয়া এই সভায় উপস্থিত ছিলেন বিদেশি কূটনীতিকসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা।
















