নয়াদিল্লি। বাংলাদেশে আসন্ন নির্বাচনের প্রচার জোরদার হওয়ার পাশাপাশি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে ভোট বর্জনের নতুন আহ্বান এবং বিভিন্ন এলাকায় জনতার সহিংসতার ঘটনায় পরিস্থিতি নিয়ে গভীর নজর রাখছে ভারত। ঢাকায় চলমান রাজনৈতিক পরিবর্তন ভারতের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে বাড়তি দুশ্চিন্তা তৈরি করেছে।
নয়াদিল্লির সরকারি নীতিনির্ধারক ও কৌশলগত বিশ্লেষকদের মতে, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত বহু সমস্যা কেবল একটি শক্তিশালী ও জনগণের ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত নির্বাচিত সরকারই দীর্ঘমেয়াদে সমাধান করতে পারে। প্রশ্ন হলো, বর্তমান অস্থিরতার মধ্যে তেমন গ্রহণযোগ্য সরকার গড়ে উঠবে কি না এবং তা কতদিন টিকে থাকবে।
২০২৪ সালের আগস্টের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক রূপান্তর বৈধতা, স্থিতিশীলতা এবং ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নিয়ে নানা প্রশ্ন তুলেছে, যার সরাসরি প্রভাব ভারতের প্রতিবেশী কৌশলের ওপর পড়ছে।
ভারতের সাবেক উপ জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব পঙ্কজ সরণ বলেন, ভারত সবসময় ঢাকার যেকোনো সরকারের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী ছিল। তিনি জানান, শেখ হাসিনার নির্বাচনের পরও বেগম খালেদা জিয়াকে ভারত রাষ্ট্রপ্রধানের মর্যাদায় স্বাগত জানিয়েছিল। একইভাবে ২০১৫ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরেও সব পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হয়েছিল।
বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনকে তিনি হঠাৎ ও সহিংস প্রক্রিয়া হিসেবে বর্ণনা করেন, যেখানে প্রতিশোধের মানসিকতা দেখা গেছে, যদিও অতীতের মতো রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ব্যাপকভাবে ঘটেনি।
ভারতের নীতিনির্ধারকদের মতে, মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন বর্তমান প্রশাসনের চরিত্র নিয়েই মূল উদ্বেগ। সমালোচকদের দাবি, এই সরকার সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার চেয়ে বিপ্লবী আন্দোলনের গতির ওপর বেশি নির্ভরশীল, যা বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
পঙ্কজ সরণ বলেন, অনেকেই মনে করেন এটি একটি পূর্ণাঙ্গ ও গ্রহণযোগ্য ক্ষমতা হস্তান্তর নয়। এই ধারণা অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক উভয় ক্ষেত্রেই জটিলতা বাড়াচ্ছে।
নিরাপত্তাও ভারতের আরেকটি বড় উদ্বেগের জায়গা। সাবেক নিরাপত্তা কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন, শেখ হাসিনার সময়ে নিয়ন্ত্রিত থাকা ইসলামপন্থী জঙ্গিবাদের পুনরুত্থান ঘটতে পারে। একই সঙ্গে নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
নীতিনির্ধারকদের মতে, আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের রাজনীতির প্রধান স্তম্ভগুলোর একটি। তাদের বাদ দিয়ে নির্বাচন হলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা সীমিত হয়ে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যেই কেন্দ্রীভূত হচ্ছে, যা প্রতিনিধিত্বমূলক ব্যবস্থাকে দুর্বল করছে।
অন্যদিকে, দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন প্রজন্মের ভোটারদের ভূমিকা বাড়ছে। একুশ শতকে জন্ম নেওয়া এই ভোটাররা মুক্তিযুদ্ধ ও রাজাকার বিভাজনের ঐতিহাসিক রাজনীতির বাইরে চিন্তা করতে পারে, যা ভবিষ্যৎ রাজনীতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, অতীতের মতো রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলো আবার সক্রিয় হতে পারে। পাশাপাশি পাকিস্তান ও তাদের গোয়েন্দা সংস্থার তৎপরতাও ভারতের জন্য বাড়তি উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশ মিয়ানমার সীমান্তে সশস্ত্র রোহিঙ্গা ক্যাম্পের উপস্থিতিও নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও স্পর্শকাতর করে তুলছে, যার প্রভাব সীমান্ত ছাড়িয়ে পুরো অঞ্চলে পড়তে পারে।
ভারতের সাবেক কূটনীতিক টিসিএ রাঘবন বলেন, ভারতের প্রতিক্রিয়ায় ভারসাম্য রাখা জরুরি। তিনি সতর্ক করেন, প্রতিবেশী দেশগুলোর রাজনীতিতে কাউকে প্রো ইন্ডিয়া বা অ্যান্টি ইন্ডিয়া বলে চিহ্নিত করা বাস্তবসম্মত নয়, কারণ সবাই নিজের জাতীয় ও দলীয় স্বার্থেই কাজ করে।
সমগ্র পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক গতিপথে ভারতের প্রভাব সীমিত। তবে গণতান্ত্রিক বৈধতা, অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ও জঙ্গিবাদ নিয়ন্ত্রণ ভারতের স্বার্থের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বর্তমানে ভারতের চ্যালেঞ্জ শুধু অপেক্ষা করে দেখা নয়, বরং জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষিত রেখে সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলার প্রস্তুতি নেওয়া।
















