মাদাগাস্কারের প্রেসিডেন্ট আন্দ্রি রাওজেলিনা সেনা-সমর্থিত বিক্ষোভের মুখে সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণা করেছেন এবং দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি এই আদেশ জারি করেন, যা আসন্ন অভিশংসন ভোটের আগেই কার্যকর হয়।
প্রেসিডেন্টের এই সিদ্ধান্ত দেশটির চলমান রাজনৈতিক সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে, কারণ সেনা ও পুলিশ বাহিনীর একটি অংশ ইতোমধ্যে রাওজেলিনার পদত্যাগ দাবিতে বিক্ষোভকারীদের পক্ষে চলে গেছে।
রাষ্ট্রপতির দপ্তর এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, সংসদ বিলুপ্তির এই আদেশ “রেডিও ও টেলিভিশনে প্রচারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কার্যকর হবে।” তবে রাষ্ট্রপতির বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে কিছু জানা যায়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পৃথক বার্তায় রাওজেলিনা বলেন, দেশের “শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও গণতন্ত্র শক্তিশালী করতেই” তিনি এই পদক্ষেপ নিয়েছেন।
বিরোধীদলীয় নেতা সিটেনি র্যান্ড্রিয়ানাসোলোনিয়াইকো এই পদক্ষেপকে “অবৈধ” বলে মন্তব্য করেন, কারণ সংসদের সভাপতি জাস্টিন টোকেলির সঙ্গে কোনো পরামর্শ ছাড়াই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এর আগে সোমবার রাতে প্রচারিত এক ভিডিওবার্তায় রাওজেলিনা জানান, তিনি নিজের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে “নিরাপদ স্থানে” আশ্রয় নিয়েছেন। রয়টার্সের এক সূত্র জানিয়েছে, তিনি রোববার ফরাসি সামরিক বিমানে দেশ ত্যাগ করেছেন, যদিও ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।
গত শনিবার সেনাবাহিনীর কয়েকটি ইউনিট সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়, যা রাওজেলিনা “অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলের চেষ্টা” হিসেবে উল্লেখ করেন। পরে সেনাবাহিনীর বিশেষ ইউনিট ক্যাপসাট ঘোষণা করে যে তারা দেশের সামরিক নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেছে। এই ইউনিটই ২০০৯ সালের অভ্যুত্থানে রাওজেলিনাকে ক্ষমতায় এনেছিল।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ২৪২৪.এমজি জানিয়েছে, মঙ্গলবার পুলিশও সেনা ও জেন্ডারমেরির সঙ্গে একাত্ম হয়ে বিক্ষোভকারীদের সমর্থন জানিয়েছে।
২৫ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ প্রথমে পানির সংকট ও বিদ্যুৎ বিভ্রাটের বিরুদ্ধে ছিল, তবে দ্রুতই তা জীবনযাত্রার ব্যয়, দারিদ্র্য এবং দুর্নীতির অভিযোগে ব্যাপক সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়।
৫১ বছর বয়সী রাওজেলিনা বলেছেন, তিনি দেশের রাজনৈতিক সংকটের সমাধান খুঁজতে “মিশনে রয়েছেন” এবং মাদাগাস্কারকে “স্ব destruction এর পথে” যেতে দেবেন না। তবে মঙ্গলবার রাজধানী আন্তানানারিভোতে হাজারো মানুষ পুনরায় তার পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ করে, যেখানে সরকারি কর্মচারী ও শ্রমিক সংগঠনও যোগ দেয়।
রাওজেলিনা ২০০৯ সালের অভ্যুত্থানের পর নিজেকে সংস্কারপন্থী হিসেবে তুলে ধরেন এবং ২০১৪ সালে সংবিধান পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর পদ ছাড়েন। পরবর্তীতে ২০১৯ সালের নির্বাচনে জয়লাভ করে আবার ক্ষমতায় ফিরে আসেন এবং ২০২৩ সালে দ্বিতীয় মেয়াদ নিশ্চিত করেন।
জাতিসংঘ জানিয়েছে, গত কয়েক সপ্তাহের বিক্ষোভে অন্তত ২২ জন নিহত এবং শতাধিক মানুষ আহত হয়েছে, যদিও সরকার এ সংখ্যা অস্বীকার করেছে। শনিবার এক সেনা সদস্যের মৃত্যুর পর থেকেই নিরাপত্তা বাহিনীর বৃহৎ অংশ বিক্ষোভকারীদের পাশে দাঁড়ায়।
দীর্ঘ সময় ধরে বিদ্যুৎ সংকটে থাকা মাদাগাস্কারের এক-তৃতীয়াংশ জনগণই কেবল বিদ্যুৎ সুবিধা পায়। প্রতিদিন গড়ে আট ঘণ্টারও বেশি লোডশেডিংয়ে জনঅসন্তোষ চরমে উঠেছে।
“জেন জি মাদাগাস্কার” নামের তরুণ নেতৃত্বাধীন এই আন্দোলন অনুপ্রাণিত হয়েছে কেনিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও পেরুর সাম্প্রতিক সরকারবিরোধী তরুণ আন্দোলন থেকে। দক্ষিণ এশিয়ায়ও এমন তরুণ নেতৃত্বাধীন আন্দোলন বাংলাদেশ, নেপাল ও শ্রীলঙ্কায় সরকার পতনের কারণ হয়েছিল।
জেন জি মাদাগাস্কার এখন পর্যন্ত সরকারের সংলাপের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে এবং রাওজেলিনার পদত্যাগ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।

















