আসন সমঝোতা নিয়ে বিরোধে ১১ দলীয় জোট থেকে ইসলামী আন্দোলনের বিদায়; জামায়াত, চরমোনাই ও বিএনপি-ঘেঁষা তিন ধারায় লড়বে ধর্মভিত্তিক দলগুলো।
আসন বণ্টন নিয়ে মতবিরোধের জেরে ভেঙে গেছে ইসলামপন্থীদের বৃহত্তর নির্বাচনী সমঝোতা। জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১০ দলীয় জোটের বাইরে এককভাবে ২৬৮ আসনে লড়বে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। ফলে ভোটের মাঠে ইসলামপন্থীদের ভোট স্পষ্টত তিনটি আলাদা ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়ল।
নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে বড় ধরনের ভাঙনের মুখে পড়েছে ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রচেষ্টা। জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ‘১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য’ থেকে বের হয়ে আসার পর ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এককভাবে লড়ার ঘোষণা দিয়েছে। এর ফলে ইসলামপন্থীদের ভোটব্যাংক এখন তিনটি প্রধান ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে, যা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফলে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) রাজধানীর পুরানা পল্টনে দলীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে ইসলামী আন্দোলনের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান জানান, তারা মোট ২৬৮টি আসনে এককভাবে মোমবাতি প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করবেন। বাকি ৩২টি আসনে তারা পছন্দের প্রার্থীকে সমর্থন দেবেন।
বিভক্তির তিন ধারা: কে কোথায়?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচনে ইসলামপন্থী দলগুলো এখন নিচের তিনটি মেরুতে অবস্থান করছে:
| ধারা | নেতৃত্ব/প্রধান দল | অবস্থান |
| প্রথম ধারা | জামায়াতে ইসলামী (১০ দলীয় ঐক্য) | ৫টি ইসলামি দলসহ এনসিপি ও এলডিপি এই মোর্চায় আছে। ২৫৩ আসনে সমঝোতা চূড়ান্ত। |
| দ্বিতীয় ধারা | ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ | এককভাবে ২৬৮ আসনে নির্বাচন করছে। জামায়াতের বিরুদ্ধে ‘অসম্মান’ ও ‘অন্যায্য’ বণ্টনের অভিযোগ। |
| তৃতীয় ধারা | বিএনপি-পন্থী ইসলামি দলসমূহ | জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম (নিবন্ধিত) ও আরও দুটি দল বিএনপির সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতায় যুক্ত। |
কেন ভাঙলো সমঝোতা?
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, আসন ভাগাভাগির হিসাব নিয়ে বিরোধই বিচ্ছেদের মূল কারণ। ইসলামী আন্দোলন ৮০টির মতো আসন দাবি করলেও জামায়াত প্রথমে ৩০-৩৫টি এবং পরে ৪৫টি দিতে রাজি হয়েছিল। এছাড়া আদর্শিক বিরোধও সামনে এসেছে। ইসলামী আন্দোলনের অভিযোগ, জামায়াত নির্বাচনে জেতার পর বিএনপির সঙ্গে ‘জাতীয় সরকার’ গঠন করবে এবং পূর্ণ শরিয়াহ আইন প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে প্রচলিত আইনে রাষ্ট্র চালাবে।
অন্যদিকে, জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, “আমরা ওনাদের জন্য ৪৭টি আসন ফাঁকা রেখেছিলাম, চেয়ারও খালি রেখেছিলাম। এরপর আর কী করার ছিল আমাদের?”
ভোটের মাঠে প্রভাব ও ঝুঁকি
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই বিভক্তির ফলে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়তে পারে জামায়াতে ইসলামী। কারণ:
- হেফাজত ও জমিয়তের অবস্থান: হেফাজতে ইসলামের একটি বড় অংশ এবং জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম সরাসরি জামায়াতের বিরোধিতা করছে।
- ভোট ভাগাভাগি: ইসলামী আন্দোলনের শক্তিশালী সাংগঠনিক ভিত্তি থাকায় অনেক আসনে তারা জামায়াত বা বিএনপি-পন্থী প্রার্থীদের জয়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
- কওমি ফ্যাক্টর: তবে মাওলানা মামুনুল হক জামায়াতের জোটে থাকায় কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক একটি বড় ভোটব্যাংক জামায়াতের পক্ষে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
ইসলামী ঐক্যজোটের মহাসচিব সাখাওয়াত হোসাইন রাজী জানিয়েছেন, তারাও শেষ মুহূর্তে বিএনপির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়ায় আছেন। সব মিলিয়ে, ইসলামপন্থীদের ‘এক বাক্স’ নীতি ব্যর্থ হওয়ায় নির্বাচনী সমীকরণ এখন নতুন ও জটিল মোড় নিয়েছে।
















