পরিবারভিত্তিক গ্রিন কার্ডসহ স্থায়ী ভিসা প্রক্রিয়া স্থগিত, কার্যকর ২১ জানুয়ারি
বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য যুক্তরাষ্ট্র অভিবাসী ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করায় লাখো বাংলাদেশি সরাসরি ক্ষতির মুখে পড়বেন বলে আশঙ্কা করছেন অভিবাসন আইনজীবীরা।
বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের জন্য যুক্তরাষ্ট্র অভিবাসী ভিসা স্থগিতের সিদ্ধান্ত কার্যকর হচ্ছে আগামী ২১ জানুয়ারি থেকে। তবে এই নিষেধাজ্ঞা পর্যটক, শিক্ষার্থী, ব্যবসা বা অন্যান্য স্বল্পমেয়াদি নন-ইমিগ্রান্ট ভিসার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না।
এই সিদ্ধান্তে বাংলাদেশে কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে—তা জানতে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসনবিষয়ক তিনজন আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলেছে প্রথম আলো। তাঁদের মতে, এই স্থগিতাদেশে লাখো বাংলাদেশি সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। কারণ যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বহু বাংলাদেশি নাগরিক ও গ্রিন কার্ডধারী তাঁদের বাবা-মা, স্বামী-স্ত্রী, সন্তান কিংবা ভাই-বোনকে সেখানে নেওয়ার জন্য দীর্ঘদিন ধরে আবেদন করে রেখেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা ব্যবস্থায় মূলত দুই ধরনের ভিসা রয়েছে—ইমিগ্রান্ট (অভিবাসী) ও নন-ইমিগ্রান্ট ভিসা। অভিবাসী ভিসার মাধ্যমে কেউ সরাসরি গ্রিন কার্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করে স্থায়ী বাসিন্দা হন। এর আওতায় পরিবারভিত্তিক গ্রিন কার্ড, স্বামী-স্ত্রী, বাবা-মা, সন্তান, ভাই-বোন এবং কর্মভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের অনুমোদন পড়ে।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এসব অভিবাসী ভিসার আবেদন প্রক্রিয়া আপাতত স্থগিত থাকবে। ফলে যাঁদের আবেদন ইতিমধ্যে জমা আছে, যাঁদের সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারিত ছিল কিংবা যাঁরা দীর্ঘ অপেক্ষমাণ তালিকায় রয়েছেন—তাঁরা কেউই আপাতত ভিসা পাবেন না। নতুন করে আবেদন করা গেলেও ভিসা ইস্যু হবে না।
নেপালি বংশোদ্ভূত যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক ও অভিবাসন আইনবিশেষজ্ঞ দিল্লি রাজ ভট্ট বলেন, “এই নতুন নীতির ফলে হাজার হাজার বাংলাদেশি সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। অনেকের নাগরিকত্ব ও অভিবাসন মামলা বছরের পর বছর ধরে ঝুলে আছে। এই সিদ্ধান্ত তাদের অপেক্ষা আরও দীর্ঘ করবে।”
তিনি জানান, এই নীতির মেয়াদ কত দিন থাকবে, সে বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন এখনো নির্দিষ্ট করে কিছু জানায়নি। তবে এর বিরুদ্ধে আইনি চ্যালেঞ্জ আসতে পারে এবং আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নির্ভর করবে।
কত বাংলাদেশি যান যুক্তরাষ্ট্রে
যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩ অর্থবছরে বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য মোট ৫৯ হাজার ২৫৪টি মার্কিন ভিসা ইস্যু করা হয়। এর মধ্যে ৪৪ হাজার ৬৭৪টি ছিল নন-ইমিগ্রান্ট এবং ১৪ হাজার ৫৮০টি ছিল ইমিগ্রান্ট ভিসা। অর্থাৎ, অধিকাংশ বাংলাদেশি স্বল্পমেয়াদি ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে যান।
হোমল্যান্ড সিকিউরিটির তথ্য বলছে, ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী বসবাসের অনুমোদন পান ১৪ হাজার ৮৯০ জন বাংলাদেশি। করোনা মহামারির সময় এই সংখ্যা কমলেও ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৮ হাজার ২৪০ জনে।
অভিবাসন আইনজীবীদের ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো কোনো বাংলাদেশি পরিবারের ১৫ থেকে ১৬ জন সদস্যের আবেদন যুক্তরাষ্ট্রে জমা রয়েছে। সব মিলিয়ে কয়েক লাখ মানুষ ধাপে ধাপে যাওয়ার অপেক্ষায় আছেন।
যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশিরা নিয়মিত দেশে অর্থ পাঠান, যা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। গত বছর প্রবাসীরা রেকর্ড ৩ হাজার ২৮২ কোটি ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকেই এসেছে প্রায় ১১ শতাংশ।
কী বলছে মার্কিন প্রশাসন
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, অভিবাসন ব্যবস্থার অপব্যবহার বন্ধ করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এমন অনেক অভিবাসী রয়েছেন, যাঁরা যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন। নতুন করে যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে এমন ব্যক্তিদের প্রবেশ ঠেকানোই এই স্থগিতাদেশের লক্ষ্য।
তবে আইনজীবীরা বলছেন, অভিবাসী ভিসা স্থগিত হলেও পর্যটন, শিক্ষার্থী, ব্যবসা ও বিনিয়োগসংক্রান্ত ভিসা প্রক্রিয়া চলমান থাকবে। বরং অভিবাসী ভিসা বন্ধ থাকায় দূতাবাসের চাপ কমবে এবং অন্যান্য ভিসা তুলনামূলক দ্রুত পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।
















