আলেপ্পো। সিরিয়ার আলেপ্পো শহরে সরকারি বাহিনী ও কুর্দি নেতৃত্বাধীন সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেসের মধ্যে তীব্র সংঘর্ষে সাধারণ মানুষ ভয়াবহ অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। নতুন করে শুরু হওয়া এই লড়াই আগের যেকোনো সংঘর্ষের চেয়ে বেশি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা।
বুধবার সকালে সংঘর্ষের খবর পেয়ে আলেপ্পোতে পৌঁছান সাংবাদিক রেসুল সেরদার আতাস। তিনি জানান, শহরে পৌঁছে যা দেখেছেন তা প্রত্যাশার চেয়েও ভয়ঙ্কর। ভারী গোলাবর্ষণ ছিল অবিরাম। তার টিম চারবার হামলার মুখে পড়ে এবং একটি গুলি তাদের সরঞ্জামে আঘাত করে।
এই দফার সংঘর্ষ সহজে থামবে না, এমন ধারণা দ্রুতই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মূলত গত মার্চে হওয়া একটি চুক্তি অনুযায়ী কুর্দি বাহিনীকে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সঙ্গে একীভূত করার বিষয়ে সরকারের দাবিকে কেন্দ্র করেই উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। তবে কতজন যোদ্ধা সেনাবাহিনীতে যুক্ত হবে এবং কীভাবে এই প্রক্রিয়া হবে, তা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে গভীর মতবিরোধ রয়েছে।
সংঘর্ষের কেন্দ্রবিন্দু ছিল আলেপ্পোর ঘনবসতিপূর্ণ আশরাফিয়েহ ও শেখ মাকসুদ এলাকা। এই দুই জেলায় প্রায় চার লাখ মানুষ বসবাস করে। লড়াই শুরুর ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই প্রায় এক লাখ ষাট হাজার মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। পুরো দৃশ্যটি ছিল একপ্রকার গণপ্রস্থান।
বৃহস্পতিবার সংঘর্ষ তীব্র হলে রাস্তায় চলাচল করা মানুষের জন্য প্রাণ বাঁচানোই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। গুলির শব্দে শিশুদের কান্না আর চিৎকারে বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। পরিবারগুলো একে অপরের হাত বা কাপড় আঁকড়ে ধরে রাখে, যেন ভিড়ে কাউকে হারিয়ে না ফেলে।
এক বৃদ্ধ ব্যক্তি বলেন, প্রায় ১৫ বছরের গৃহযুদ্ধে তিনি সবকিছু দেখে ফেলেছেন। তার ভাষায়, এখন শুধু শান্তি চান, জীবনের আর কিছু চাওয়ার নেই।
আরেকটি ঘটনায় দেখা যায়, চলতে না পারা এক বৃদ্ধা ভিড়ের মধ্যে পড়ে গেলে লোকজনের পায়ের নিচে চাপা পড়েন। তার ছেলেকে কান্নায় ভেঙে পড়তে দেখা যায়, যখন তিনি মাকে তুলতে চেষ্টা করছিলেন।
এই দৃশ্যগুলো ২০১৪ সালে কোবানে শহরে আইএসের হামলার সময়ের স্মৃতি ফিরিয়ে আনে। তখনও মানুষের মধ্যে ছিল গভীর হতাশা, অসহায়ত্ব আর সবকিছু শেষ হয়ে যাওয়ার অনুভূতি।
শুক্রবার সকালে স্বল্প সময়ের জন্য যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয় দুই পক্ষ। কুর্দি বাহিনীর নেতৃত্ব জানায়, তারা ভারী অস্ত্র ফেলে এলাকা ছাড়বে। কিন্তু যোদ্ধাদের সরিয়ে নিতে বাস এলে আবারও সংঘর্ষ শুরু হয়। পরে আবার একই ঘটনা ঘটে। স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, কুর্দি বাহিনীর ভেতরের বিভাজনের কারণেই কিছু গোষ্ঠী অস্ত্র নামাতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে।
শেষ পর্যন্ত সিরীয় সরকার শুক্রবার সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত বেসামরিক মানুষকে এলাকা ছাড়ার সময় বেঁধে দেয়। নির্ধারিত সময়ের পর আবার সামরিক অভিযান শুরু হয় এবং শেখ মাকসুদ এলাকায় নতুন করে তীব্র লড়াই চলছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কুর্দি যোদ্ধাদের সরিয়ে নেওয়ার পর সবাই নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে যেতে পারবে। তারা জোর দিয়ে বলছে, এটি আরব ও কুর্দিদের মধ্যে কোনো জাতিগত সংঘাত নয়, বরং রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও একটি রাষ্ট্রবহির্ভূত সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যকার লড়াই।
এদিকে আলেপ্পোর মানুষ এখন আশার সঙ্গে ভয়ও বয়ে বেড়াচ্ছে। একদিকে তারা চায় সরকার ও কুর্দি বাহিনীর মধ্যে একটি সমঝোতা হোক, যাতে তারা ঘরে ফিরতে পারে। অন্যদিকে, দীর্ঘ ১৫ বছরের গৃহযুদ্ধের অভিজ্ঞতা তাদের মনে ভয় জাগাচ্ছে, ইতিহাস যেন আবারও নিজেকে পুনরাবৃত্তি করতে চলেছে।
















