রাশিয়া ইউক্রেনে ওরেশনিক নামে পরিচিত একটি হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে বলে শুক্রবার মস্কো নিশ্চিত করেছে। এই ক্ষেপণাস্ত্রটি আঘাত হেনেছে এমন একটি শহরে, যা পোল্যান্ড সীমান্ত থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে। পোল্যান্ড ন্যাটোর সদস্য হওয়ায় এই হামলাকে বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এই হামলা এমন এক সময়ে হয়েছে, যখন ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে শান্তি আলোচনার চেষ্টা কার্যত স্থবির হয়ে আছে। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, ইউক্রেনের পাশাপাশি ইউরোপীয় ও পশ্চিমা মিত্রদের ভয় দেখাতেই রাশিয়া এই পদক্ষেপ নিয়েছে।
কী ঘটেছে
রুশ সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, কিয়েভ ও আশপাশের এলাকায় ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামো এবং ড্রোন উৎপাদন কেন্দ্র লক্ষ্য করে একাধিক হামলার অংশ হিসেবে ওরেশনিক ক্ষেপণাস্ত্রটি ব্যবহার করা হয়। মস্কোর দাবি, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের নোভগোরোদে অবস্থিত বাসভবনে ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলার প্রতিক্রিয়ায় এই আক্রমণ চালানো হয়েছে। তবে কিয়েভ এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও এমন হামলার দাবি নাকচ করেছেন।
ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, সর্বশেষ হামলায় কিয়েভে চারজন নিহত এবং অন্তত ২২ জন আহত হয়েছেন। একই সঙ্গে লভিভ শহরের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতেও একটি দ্রুতগতির ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে, যার গতি ছিল ঘণ্টায় প্রায় ১৩ হাজার কিলোমিটার।
কোথায় আঘাত হেনেছে
রাশিয়ার দাবি অনুযায়ী, লভিভে চালানো হামলাতেই ওরেশনিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহৃত হয়েছে। পশ্চিম ইউক্রেনের এই শহরটি রাজধানী কিয়েভ থেকে প্রায় ৫৫০ কিলোমিটার দূরে এবং পোল্যান্ড সীমান্ত থেকে মাত্র ৭০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
ওরেশনিক কী
ওরেশনিক একটি মধ্য পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। রুশ ভাষায় এর অর্থ হ্যাজেল গাছ। ক্ষেপণাস্ত্রটি একাধিক ওয়ারহেড বহন করতে পারে, যা আকাশে আলোর রেখার মতো ছড়িয়ে পড়ে। হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র শব্দের গতির পাঁচ গুণ বা তার বেশি গতিতে চলতে পারে এবং মাঝপথে দিক পরিবর্তনের সক্ষমতা থাকায় এগুলো শনাক্ত ও প্রতিহত করা কঠিন।
ওরেশনিক পারমাণবিক ওয়ারহেড বহনে সক্ষম হলেও সব সময় তা ব্যবহার করা হয় না। ধারণা করা হয়, এর কার্যকর পাল্লা প্রায় এক হাজার থেকে এক হাজার ছয়শ কিলোমিটার। ২০২৪ সালের নভেম্বরে ইউক্রেনে একবার এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছিল রাশিয়া, তখন সেটি একটি সামরিক কারখানায় আঘাত হেনেছিল বলে দাবি করা হয়।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন বলেছেন, অত্যন্ত উচ্চগতির কারণে এই ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা প্রায় অসম্ভব এবং প্রচলিত ওয়ারহেড ব্যবহার করলেও এর ধ্বংসক্ষমতা অনেক ক্ষেত্রে পারমাণবিক অস্ত্রের কাছাকাছি। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বেলারুশে ওরেশনিক মোতায়েন করে রাশিয়া, যা ভবিষ্যতে ইউরোপ লক্ষ্য করার সক্ষমতা বাড়িয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
কেন এই হামলা গুরুত্বপূর্ণ
২০২৪ সালের হামলায় ওরেশনিক ক্ষেপণাস্ত্রে পরীক্ষামূলক ডামি ওয়ারহেড ব্যবহার করা হয়েছিল, ফলে ক্ষয়ক্ষতি তুলনামূলক কম ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক হামলায় যদি বিস্ফোরক ওয়ারহেড ব্যবহার হয়ে থাকে, তবে সেটি হবে ইউক্রেনে ওরেশনিকের পূর্ণ প্রচলিত ক্ষমতা প্রয়োগের প্রথম ঘটনা।
এ ছাড়া এবার লক্ষ্যবস্তু নির্বাচনের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। আগের হামলাটি ইউক্রেনের অভ্যন্তরে হলেও এবার আঘাত হানা হয়েছে ন্যাটো সদস্য পোল্যান্ডের খুব কাছাকাছি। ইউক্রেন এই ঘটনাকে ইউরোপীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি হিসেবে বর্ণনা করেছে। ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা বলেছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটো সীমান্তের কাছে এমন হামলা গোটা ইউরোপের নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক এবং রাশিয়ার বেপরোয়া আচরণের জবাবে কঠোর প্রতিক্রিয়া প্রয়োজন।
যুক্তরাজ্য জানিয়েছে, ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানির নেতারা এক ফোনালাপে রাশিয়ার এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের নিন্দা জানিয়েছেন এবং একে উত্তেজনা বাড়ানোর শামিল বলে উল্লেখ করেছেন।
এর প্রভাব কী হতে পারে
এই হামলা এমন সময়ে হয়েছে, যখন যুদ্ধ বন্ধে শান্তি আলোচনায় কোনো অগ্রগতি নেই এবং আগামী ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ পঞ্চম বছরে পা দেবে। নতুন করে সংঘর্ষের তীব্রতা বাড়ায় যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা আরও ক্ষীণ হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভূখণ্ড নিয়ে মতবিরোধই আলোচনার সবচেয়ে বড় বাধা। ট্রাম্প ঘোষিত শান্তি পরিকল্পনায় ইউক্রেনকে দখলকৃত ও নিয়ন্ত্রিত কিছু এলাকা ছাড়ার প্রস্তাব দেওয়া হলেও প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি তা বারবার প্রত্যাখ্যান করেছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে আলোচনার পথ আগেই জটিল ছিল, সাম্প্রতিক হামলা সেই জটিলতাই আরও স্পষ্ট করেছে। তাদের মতে, রাশিয়া আলোচনাকে পুরোপুরি ভেস্তে দিতে নয়, বরং তা চলমান রেখে সামরিক চাপ অব্যাহত রাখার কৌশল নিচ্ছে।
















