ডিজিটাল রূপান্তরের নামে আইসিটি খাতে হরিলুট; প্রশিক্ষক-প্রশিক্ষণার্থী ছাড়াই তোলা হয়েছে মেগা প্রকল্পের বিল
সদ্য প্রকাশিত শ্বেতপত্রে বিগত সরকারের আমলের রাষ্ট্রীয় অর্থের নজিরবিহীন অপচয় ও দুর্নীতির এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। প্রতিবেদনে দেখা গেছে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল ও প্রচারণার আড়ালে ‘মুজিব ভাই’ নামক একটি চলচ্চিত্র নির্মাণেই খরচ করা হয়েছে ৪ হাজার ২১১ কোটি ২২ লাখ টাকা। সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশন (সিআরআই)-এর মাধ্যমে এই বিশাল অংকের অর্থ ব্যয় করা হয়, যা একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে বিশ্বে বিরল ও অস্বাভাবিক। এছাড়া ‘খোকা’ নামক আরেকটি চলচ্চিত্রের জন্য ১৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়ার তথ্যও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
শ্বেতপত্রে সবচেয়ে বেশি অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে আইসিটি বা তথ্য-প্রযুক্তি খাতে। ডিজিটাল রূপান্তরের নামে মেগা প্রকল্পগুলোতে ব্যাপক স্বজনপ্রীতি, সিন্ডিকেট এবং অযৌক্তিক ব্যয়ের ঘটনা ঘটেছে। হাই-টেক পার্ক ও আইটি ট্রেনিং সেন্টার নির্মাণ প্রকল্পে সক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি অর্থ বরাদ্দ দিয়ে সরকারি তহবিল তছরুপ করা হয়েছে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে প্রশিক্ষক কিংবা প্রশিক্ষণার্থী—কেউ না থাকলেও কাগজ-কলমে প্রশিক্ষণ দেখিয়ে সম্পূর্ণ বিল উত্তোলন করে নেওয়ার মতো চাঞ্চল্যকর ঘটনা ধরা পড়েছে। ‘লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং ডেভেলপমেন্ট’ প্রজেক্টের অধীনে ভুয়া প্রশিক্ষক নিয়োগ এবং দক্ষতা ছাড়াই সার্টিফিকেট বিতরণের মাধ্যমে হাজার হাজার ‘কাগুজে ফ্রিল্যান্সার’ তৈরি করা হয়েছে, যাদের বাস্তবে কোনো কর্মসংস্থান হয়নি।
উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ প্রফেসর ড. নিয়াজ আসাদুল্লাহর নেতৃত্বে গঠিত এই শ্বেতপত্র কমিটি স্পষ্ট করেছে যে, এটি কোনো ব্যক্তি বা দলের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক দলিল নয়। বরং ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাই এর মূল লক্ষ্য। প্রতিবেদনে আইসিটি খাতে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, স্বাধীন অডিট ব্যবস্থা এবং কঠোর নজরদারি বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে। ড. নিয়াজ আসাদুল্লাহর সঙ্গে এই কমিটিতে ছিলেন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ আসিফ শাহরিয়ার সুস্মিত, বুয়েট অধ্যাপক রিফাত শাহরিয়ার এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক চৌধুরী মফিজুর রহমানসহ আরও বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট বিশেষজ্ঞ।
বিশেষজ্ঞরা এই প্রতিবেদনকে স্বাগত জানালেও এর বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “শ্বেতপত্রে দুর্নীতির অকাট্য প্রমাণ উঠে এসেছে। তবে সরকার যদি প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি পর্যায়ে কঠোর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে না পারে, তবে এটি অতীতের মতো কেবল একটি ফাইলবন্দি দলিল হয়েই থেকে যাবে।” শ্বেতপত্রে উঠে আসা এই হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির বিচার এবং লোপাট হওয়া অর্থ উদ্ধারে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কী পদক্ষেপ নেয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
















