ঢাকা, ১২ অক্টোবর ২০২৫
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক প্রতীকী প্রতিষ্ঠান — ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)
আবারও রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেওয়া “আজীবন সদস্যপদ” নিয়ে নতুন ডাকসু নেতৃত্ব ও শিক্ষার্থীদের তীব্র প্রতিবাদে ক্যাম্পাস উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।
এই বিতর্ক শুধু একটি সাংগঠনিক সিদ্ধান্তের প্রশ্ন নয় , এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরাধিকার, ক্ষমতার প্রতীকবোধ ও রাজনৈতিক স্মৃতির পুনর্মূল্যায়নকেও সামনে এনেছে।
২০১৯ সালের সিদ্ধান্ত ও তার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
২০১৯ সালের মার্চে অনুষ্ঠিত ডাকসুর প্রথম সভায় তৎকালীন ছাত্রলীগপন্থী প্রতিনিধিদের প্রস্তাবে শেখ হাসিনাকে আজীবন সদস্য করা হয়। সেই সময়ের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী এবং আন্তর্জাতিক সম্পাদক শাহরিমা তানজিনা অর্নি উদ্যোগী ছিলেন প্রস্তাবটির পেছনে।
কিন্তু সেই সভাতেই ডাকসুর সহসভাপতি নুরুল হক নুর ও সমাজসেবা সম্পাদক আখতার হোসেন এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করেন। তাদের যুক্তি ছিল, ডাকসুর গঠনতন্ত্রে আজীবন সদস্যপদের কোনো বৈধ বিধান নেই , ফলে সিদ্ধান্তটি “গণতান্ত্রিক অনুশাসনের পরিপন্থী”।
সেই সময় বিষয়টি রাজনৈতিক প্রতীকী অর্থে ব্যাখ্যা করা হয়েছিল শিক্ষার্থীদের স্বাধীন সংগঠনের ওপর সরকারের ছায়া বিস্তারের একটি নজির হিসেবে।
গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন প্রজন্মের অবস্থান
২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের পর শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটলে, ছয় বছর পর নতুনভাবে ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
নতুন নেতৃত্বে ছাত্রশিবির ও বিভিন্ন স্বাধীন জোটের প্রার্থীরা নিরঙ্কুশ জয় পেয়ে ক্ষমতায় আসে।
এই পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় শেখ হাসিনার আজীবন সদস্যপদ “গণঅভ্যুত্থানের চেতনার পরিপন্থী” হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নতুন ডাকসু ভিপি আবু সাদিক কায়েম বলেন,
“শেখ হাসিনা স্বৈরাচারের প্রতীক। ডাকসু হলো শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক প্ল্যাটফর্ম — এখানে কোনো খুনি বা দমননীতির প্রতীক থাকার জায়গা নেই।”
ডাকসুর নবনির্বাচিত সহ-সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) মহিউদ্দিন খান জানিয়েছেন,
“আগামী সাধারণ সভায় শেখ হাসিনার আজীবন সদস্যপদ বাতিলের প্রস্তাব আনা হবে। এটি নৈতিক ও সাংবিধানিক দায়।”
শিক্ষার্থীদের প্রতিক্রিয়া:
স্মৃতি ও প্রতিরোধের সংঘাত ক্যাম্পাসজুড়ে শেখ হাসিনার সদস্যপদ বাতিল নিয়ে তীব্র আলোচনা চলছে। ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী মাহমুদুল হাসান বলেন,
“ডাকসুর ইতিহাসে সবচেয়ে লজ্জাজনক সিদ্ধান্ত ছিল একজন ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রীকে আজীবন সদস্য করা। সেটা ছিল স্বাধীন ছাত্ররাজনীতির ওপর সরকারের দখলের প্রতীক।”
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের এক শিক্ষার্থী যোগ করেন,
“২০১৯ সালের ডাকসু ছিল সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন। নতুন প্রজন্ম সেই শৃঙ্খল ভাঙতে চায়।”
এই প্রতিক্রিয়াগুলো শুধু একজন ব্যক্তিকে ঘিরে নয় — বরং প্রজন্মান্তরের রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ক্ষমতার প্রতীকবোধ বনাম গণতান্ত্রিক স্মৃতি রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, শেখ হাসিনাকে আজীবন সদস্য করা ছিল তৎকালীন সরকারের প্রতীকী প্রভাব বিস্তারের একটি প্রচেষ্টা — একটি “রাষ্ট্রীয় মডেল” যেখানে শিক্ষার্থী রাজনীতিকে শাসক দলের আনুগত্যের মধ্যে আনা হয়েছিল।
কিন্তু ২০২৫ সালের নতুন প্রজন্ম সেটিকে দেখছে গণতান্ত্রিক অপমানের স্মৃতি হিসেবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানী ড. সাবিহা রহমান CNN-কে বলেন,
“আজীবন সদস্যপদ বিতর্ক আসলে প্রজন্মের পুনরুত্থানকে নির্দেশ করছে। নতুন ছাত্রসমাজ রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের প্রতীকগুলোকে মুছে ফেলে স্বাধীন রাজনৈতিক পরিচয় পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে।”
আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া ও কূটনৈতিক প্রেক্ষাপট
এই বিতর্ক ঢাকার সীমা ছাড়িয়ে আঞ্চলিক প্রতীকী অর্থও বহন করছে। ভারতের গণমাধ্যমগুলো শেখ হাসিনার “রাজনৈতিক উত্তরাধিকার হারানো” হিসেবে ঘটনাটিকে ব্যাখ্যা করেছে, অন্যদিকে পশ্চিমা বিশ্লেষকরা একে “বাংলাদেশে প্রজন্মান্তরের রাজনৈতিক পুনর্জাগরণ” হিসেবে দেখছেন।
চীন ও দক্ষিণ এশিয়ার কিছু পর্যবেক্ষণমাধ্যম সতর্ক করে বলছে —
“হাসিনার নাম অপসারণের প্রশ্নটি যদি প্রতিশোধমূলক রাজনীতিতে পরিণত হয়, তবে এটি বাংলাদেশের শিক্ষার্থী রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ সৃষ্টি করতে পারে।”
প্রতীকী পুনর্গঠনের এক সন্ধিক্ষণ ডাকসুর শেখ হাসিনা বিতর্ক বাংলাদেশের রাজনীতির এক গভীর প্রতিফলন ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়া নেতাদের উত্তরাধিকার কীভাবে পুনর্মূল্যায়িত হবে, এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের ইতিহাস কীভাবে পুনর্লিখবে ,এই প্রশ্নই এখন মুখ্য হয়ে উঠেছে।
নতুন ডাকসু নেতৃত্ব যদি শেখ হাসিনার আজীবন সদস্যপদ বাতিল করে, তবে এটি শুধু একটি সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং বাংলাদেশের গণতন্ত্রে নতুন প্রজন্মের নৈতিক অবস্থান ঘোষণা হয়ে থাকবে।
ড. সাবিহা রহমানের ভাষায় —
“ডাকসুর সদস্যপদ প্রশ্নে যা ঘটছে, তা শুধু ইতিহাস সংশোধন নয় — এটি একটি প্রজন্মের আত্মপরিচয়ের লড়াই।”
















