দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপ নীতি ও আদর্শ দ্বারা পরিচালিত হয়ে এসেছে। তবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে সেই বাস্তবতা বদলে গেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এখন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সিদ্ধান্ত অনেকটাই নির্ভর করছে তাৎক্ষণিক খেয়ালখুশি ও ব্যক্তিগত বিবেচনার ওপর।
রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরাক যুদ্ধ শুরুর জন্য জর্জ ডব্লিউ বুশ প্রশাসনার কঠোর সমালোচনা করেছিলেন। অথচ দ্বিতীয় মেয়াদে এসে তিনিই এমন এক সামরিক অভিযানের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যা অনেকের কাছে ইরাক যুদ্ধের স্মৃতি ফিরিয়ে আনছে। জাতীয় নিরাপত্তার দুর্বল যুক্তি দেখিয়ে, তেলের স্বার্থকে সামনে রেখে এক বিদেশি নেতাকে সরাতে সামরিক হস্তক্ষেপের সিদ্ধান্ত নিয়েছে তার প্রশাসন। ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের এই হস্তক্ষেপে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস ও বাস্তবতা-বিচ্ছিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির ছাপ স্পষ্ট বলে মন্তব্য করেছেন পর্যবেক্ষকরা।
তবে আগের মার্কিন সামরিক অভিযানের সঙ্গে ভেনেজুয়েলার ঘটনায় একটি বড় পার্থক্য রয়েছে। অতীতের প্রায় সব সরকার পরিবর্তনের উদ্যোগই কোনো না কোনো বৃহৎ আদর্শিক কাঠামোর মধ্যে পড়ে। কিন্তু ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে সেই স্পষ্ট দিকনির্দেশনা অনুপস্থিত। হামলার পর ট্রাম্প প্রশাসন কী চায় বা দেশটির ভবিষ্যৎ নিয়ে তাদের পরিকল্পনা কী, তা পরিষ্কার হয়নি। বরং আরও হামলার হুমকি দিয়ে পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তোলা হয়েছে।
ইতিহাসে দেখা যায়, মনরো নীতি থেকে শুরু করে ঠান্ডা যুদ্ধ, মানবিক হস্তক্ষেপ কিংবা সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ—প্রতিটি সামরিক পদক্ষেপই কোনো বৃহৎ কৌশল বা আদর্শিক ব্যাখ্যার সঙ্গে যুক্ত ছিল। কিন্তু ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসন কখনো মানবিকতা, কখনো সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ, আবার কখনো মনরো নীতির কথা তুলে ধরেছে। এমনকি মনরো নীতিকে ব্যঙ্গ করে ‘ডনরো ডকট্রিন’ বলেও উল্লেখ করেছেন ট্রাম্প, যা অনেকের কাছে তার পররাষ্ট্রনীতির অসারতাকেই তুলে ধরে।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প কোনো সুসংহত আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য নয়, বরং দেখেছেন যে তিনি সামরিক শক্তি ব্যবহার করেও রাজনৈতিকভাবে পার পেয়ে যাচ্ছেন—এই উপলব্ধি থেকেই আরও আক্রমণাত্মক অবস্থান নিচ্ছেন। দুর্বল প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে হামলা তার রাজনৈতিক সমর্থকদের কাছে জনপ্রিয় হচ্ছে। একই সঙ্গে বিদেশে মাদক ও অপরাধ দমনের নামে সামরিক শক্তি ব্যবহারের যুক্তি দেখিয়ে তিনি দেশের ভেতরেও কঠোর ও সামরিকীকৃত নীতি বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
আগের অনেক মার্কিন প্রেসিডেন্টের নীতির ফল ভয়াবহ হলেও, অন্তত তাদের সিদ্ধান্তে একটি ধারাবাহিকতা ও পূর্বানুমেয়তা ছিল। ট্রাম্পের ক্ষেত্রে সেই ধারাবাহিকতা অনুপস্থিত। সমালোচকদের মতে, তিনি স্বল্পমেয়াদি লাভ, রাজনৈতিক সুবিধা বা মনোযোগ ঘোরানোর জন্য যেকোনো সময় সামরিক শক্তি ব্যবহার করতে পারেন। এতে ভবিষ্যতে গ্রিনল্যান্ডের মতো অঞ্চল নিয়েও সামরিক পদক্ষেপের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
গত বছর শুল্ককে যেভাবে নির্বিচারে ব্যবহার করা হয়েছে, এখন তেমনি সামরিক শক্তিও সহজ হাতিয়ার হয়ে উঠছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষকরা। জলবায়ু সংকট, যুদ্ধ ও দারিদ্র্য যখন একসঙ্গে বিশ্বকে চাপে ফেলছে, তখন সুস্পষ্ট কৌশল ছাড়া এমন এক শক্তিধর দেশের অস্থির ও আগ্রাসী আচরণ আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন তারা।
















