ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চল আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে পুনর্গঠনের স্বপ্ন দেখা বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী Southern Transitional Council বা এসটিসির সেই লক্ষ্য এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। একসময় কার্যত দক্ষিণ ইয়েমেনের বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ থাকলেও অতিরিক্ত আগ্রাসী পদক্ষেপে সেই অবস্থান নিজেরাই নষ্ট করেছে তারা।
২০১৭ সালের শেষ দিকে আদেনে নামলে বিমানবন্দরে ও শহরের বিভিন্ন স্থানে তখন সাবেক দক্ষিণ ইয়েমেনের পতাকা ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের পতাকা চোখে পড়ত। ইয়েমেন রাষ্ট্রের পতাকা ছিল প্রায় অদৃশ্য। সে সময় এসটিসি গঠনের কয়েক মাস পার হয়েছে মাত্র। গোষ্ঠীর নেতা Aidarous al-Zubaidi স্পষ্টভাবেই জানিয়ে দেন, ইয়েমেন থেকে আলাদা হয়ে দক্ষিণ ইয়েমেন রাষ্ট্র গঠনই তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য।
হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ইয়েমেন সরকারের সঙ্গে একই শিবিরে থাকলেও ২০১৯ সালে আদেনসহ দক্ষিণাঞ্চলে সরকারি বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে এসটিসি। শেষ পর্যন্ত আদেন থেকে সরকারকে হটিয়ে দেয় তারা। এরপর কয়েক বছর ধরে দক্ষিণ ইয়েমেনের বড় অংশে কার্যত এসটিসির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। এমনকি সৌদি সমর্থিত প্রেসিডেনশিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলে সহসভাপতি হিসেবেও জায়গা পান আল-জুবাইদি।
গত সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ফাঁকে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আল-জুবাইদি দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানই ইয়েমেনের জন্য সেরা বলে মন্তব্য করেন। তখন অনেকেই মনে করেছিলেন, দক্ষিণ ইয়েমেন আলাদা হওয়ার পথ প্রায় নিশ্চিত।
কিন্তু গত মাসে তিনি বড় ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেন। এসটিসি বাহিনীকে পূর্বাঞ্চলীয় হাদরামাউত ও আল-মাহরা প্রদেশে পাঠানোর চেষ্টা করে পুরো সাবেক দক্ষিণ ইয়েমেনের নিয়ন্ত্রণ নিতে চান। এই পদক্ষেপই সৌদি আরবের জন্য লাল রেখা অতিক্রম করে ফেলে।
এরপর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। আল-জুবাইদি আত্মগোপনে চলে যান, ইয়েমেন সরকারের অনুগত বাহিনী দক্ষিণ ইয়েমেনের বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ নেয়, আর এসটিসির বহু মিত্র পক্ষ পরিবর্তন করে। এদিকে, এসটিসির প্রধান পৃষ্ঠপোষক United Arab Emirates আপাতত পিছু হটে, বাস্তবতা মেনে নেয় যে ইয়েমেনে প্রধান বিদেশি শক্তি এখন Saudi Arabia।
কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে দক্ষিণ ইয়েমেনের বিচ্ছিন্নতা যেখানে বাস্তবের কাছাকাছি মনে হচ্ছিল, সেখানে এখন তা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে দূরের স্বপ্ন। মাত্র এক সপ্তাহ আগেও আল-জুবাইদি দুই বছরের অন্তর্বর্তীকাল শেষে স্বাধীনতা গণভোট ও ‘দক্ষিণ আরব’ রাষ্ট্র ঘোষণার কথা বলেছিলেন।
কিন্তু এর মধ্যেই এসটিসির ভেতরের বিভাজন স্পষ্ট হয়েছে। প্রেসিডেনশিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের আরেক সদস্য আবদুল রহমান আল-মাহরামি, যিনি আবু জারা নামেও পরিচিত, রিয়াদে অবস্থান নিয়ে সৌদি শিবিরে নিজের অবস্থান শক্ত করছেন।
সৌদি সমর্থনে ইয়েমেন সরকার এখন হুথিবিরোধী বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীকে একক কমান্ডের আওতায় আনতে চাইছে। একই সঙ্গে ‘দক্ষিণ প্রশ্ন’ নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত থাকলেও কঠোর বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মূল দাবি, অর্থাৎ পূর্ণ স্বাধীনতা, বর্তমান পরিস্থিতিতে আলোচনার বাইরে চলে গেছে। পরিবর্তে শক্তিশালী আঞ্চলিক প্রতিনিধিত্বসহ একটি ফেডারেল ইয়েমেনের ধারণাই সামনে আসছে।
তবে ইয়েমেনের বাস্তবতায় পরিস্থিতি আবার বদলেও যেতে পারে। আল-ধালেসহ কয়েকটি প্রদেশে দক্ষিণ বিচ্ছিন্নতার প্রতি সমর্থন এখনও শক্ত। কঠোর এসটিসি সমর্থকেরা সহজে হাল ছাড়বে না, যা ভবিষ্যতে নতুন অস্থিরতার বীজ বপন করতে পারে।
এদিকে প্রেসিডেন্ট রাশাদ আল-আলিমির জন্য বড় পরীক্ষা হলো, তিনি কি আদেনে ফিরে এসে বাস্তবভাবে দেশ শাসন করতে পারবেন, নাকি সৌদি সামরিক শক্তির ওপরই তার ক্ষমতা নির্ভর করবে। দক্ষিণ ইয়েমেন প্রশ্নে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ এসটিসির জন্য সাময়িক ধাক্কা নাকি দীর্ঘমেয়াদি পরাজয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
















