ঢাকা-চট্টগ্রাম রুট এখন সবচেয়ে বড় ‘ডেঞ্জার স্পট’; হাইওয়ে পুলিশের অকার্যকারিতা নিয়ে ক্ষোভ
দেশের প্রধান মহাসড়কগুলোতে রাতের বেলায় চলাচল এখন যেন মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। গত ১১ মাসে সারাদেশে ২ হাজার ৪৪১টি ডাকাতি ও দস্যুতার ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে, যা গত পাঁচ বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। বিশেষ করে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক এখন ডাকাতদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। হাইওয়ে পুলিশের টহল ব্যবস্থা আগের মতো কার্যকর না থাকায় এবং শীতকালীন কুয়াশার সুযোগ নিয়ে সংঘবদ্ধ চক্রগুলো বিদেশফেরত প্রবাসী ও দূরপাল্লার বাসে বেপরোয়া হামলা চালাচ্ছে। যাত্রী ও পরিবহন শ্রমিকদের মধ্যে এখন চরম নিরাপত্তাহীনতা ও উদ্বেগ বিরাজ করছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান এবং সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মহাসড়কগুলোতে অপরাধীদের দৌরাত্ম্য বর্তমানে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।
পরিসংখ্যানে অপরাধের ভয়াবহ চিত্র
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যমতে, ২০২১ সালে ডাকাতি ও দস্যুতার মামলা ছিল ১,২৭৯টি, যা ২০২৪ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ১,৯০২টিতে। আর ২০২৫ সালের প্রথম ১১ মাসেই এই সংখ্যা ২,৪০০ ছাড়িয়ে গেছে।
- মামলার ধরণ: গত ১১ মাসে ৬৩৮টি ডাকাতি এবং ১,৮০৩টি দস্যুতার মামলা হয়েছে। তবে ভুক্তভোগীদের দাবি, অনেক ক্ষেত্রেই পুলিশ মামলা নিতে না চাওয়ায় প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে কয়েকগুণ বেশি।
- বিপজ্জনক সড়ক: ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কাঁচপুর, দাউদকান্দি, চান্দিনা ও ফেনী অংশকে ‘রেড জোন’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এছাড়া ঢাকা-সিলেট ও ঢাকা-ময়মনসিংহ রুটেও হামলা বেড়েছে।
ভয়ংকর সব সাম্প্রতিক হামলা
সম্প্রতি ঘটে যাওয়া কয়েকটি লোমহর্ষক ঘটনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়: ১. ইসলামী বক্তার ওপর হামলা: গত রোববার আড়াইহাজারে মুফতি হাবিবুল্লাহ সিদ্দিকীর গাড়িতে হামলা চালিয়ে ডাকাতরা তাঁর সহযোগীদের কুপিয়ে জখম করে। ২. প্রবাসী ও পর্যটক টার্গেট: কুমিল্লার দাউদকান্দি ও মেঘনা সেতু সংলগ্ন এলাকায় মাত্র তিন মিনিটের জ্যামের মধ্যে মাইক্রোবাস ভাঙচুর করে স্বর্ণালংকার ও নগদ অর্থ লুটে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ৩. আহমদ বিন ইউসুফ আজহারীর অভিজ্ঞতা: আন্তর্জাতিক কোরআন তিলাওয়াত সংস্থার সভাপতি জানান, তাঁর চোখের সামনেই মহাসড়কে একাধিক ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে।
প্রশাসনের সীমাবদ্ধতা ও ব্যাখ্যা
হাইওয়ে পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি দেলোয়ার হোসেন মিঞা স্বীকার করেছেন যে, শীতকালীন কুয়াশা ও গতির সীমাবদ্ধতার কারণে পুলিশ সবসময় দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পারে না। তবে অপরাধ বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. উমর ফারুক মনে করেন, এটি কেবল কুয়াশার বিষয় নয়, বরং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সামগ্রিক তদারকির অভাব এবং কমান্ড চেইনে শিথিলতার ফসল।
নিরাপত্তাহীনতায় পরিবহন শ্রমিকরা
ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান চালকদের অভিযোগ, ডাকাতরা আগে থেকেই পণ্যের খবর রাখে। মহাসড়কের নির্জন স্থানে রাস্তা ব্যারিকেড দিয়ে তারা চালকদের বেঁধে রেখে মালামালসহ গাড়ি নিয়ে চম্পট দেয়। অনেক চালক এখন প্রাণভয়ে রাতে গাড়ি চালাতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন।
করণীয় ও জনদাবি
ভুক্তভোগী ও বিশেষজ্ঞরা দ্রুত কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন:
- ঝুঁকিপূর্ণ স্পটগুলোতে স্থায়ী সিসিটিভি ক্যামেরা ও অতিরিক্ত আলোর ব্যবস্থা করা।
- হাইওয়ে ও জেলা পুলিশের সমন্বিত যৌথ টহল নিশ্চিত করা।
- প্রবাসীদের যাতায়াতের সময় বিশেষ নিরাপত্তা স্কোয়াড গঠন।
- চিহ্নিত ডাকাতচক্রকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান।
















