‘বাংলাদেশি’ তকমা দিয়ে পরিযায়ী কর্মীদের নথিপত্র ছিঁড়ে মারধর; পেট্রোল ঢেলে পুড়িয়ে মারার চেষ্টার অভিযোগ
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে কাজের সন্ধানে অন্য রাজ্যে যাওয়া মুসলিম পরিযায়ী শ্রমিকদের ওপর ভয়াবহ নির্যাতনের খবর পাওয়া গেছে। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোতে মুসলিম শ্রমিকদের ‘বাংলাদেশি’ তকমা দিয়ে শারীরিক লাঞ্ছনা ও ভিটেমাটি ছাড়া করার ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ওড়িশা ও ছত্তিশগড় থেকে প্রাণভয়ে পালিয়ে আসা শ্রমিকদের বর্ণনায় উঠে এসেছে উগ্র হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীর নির্মম অত্যাচারের চিত্র। অনেক ক্ষেত্রে পরিচয়পত্র দেখার পর মুসলিম নাম নিশ্চিত হয়েই তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে হামলাকারীরা।

সর্বশেষ মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটেছে ওড়িশার সম্বলপুর জেলার পিঠেবালি এলাকায়। মুর্শিদাবাদের ধুলিয়ানের বাসিন্দা ২৭ বছর বয়সী রাজমিস্ত্রি এজাজ আলী গত সপ্তাহে উগ্রবাদী হামলার শিকার হন। দুই মাস আগে ১৫ জনের একটি দলের সাথে সম্বলপুরে নির্মাণ কাজে গিয়েছিলেন তিনি।
এজাজের বর্ণনামতে, গেরুয়া পোশাক পরা এবং কপালে তিলক লাগানো একদল যুবক তাদের ডেরায় ঢুকে আধার ও ভোটার কার্ড দেখতে চায়। নথিপত্র পরীক্ষার পর তারা এজাজসহ অন্যদের ‘বাংলাদেশি’ বলে গালিগালাজ করে এবং আধার কার্ডগুলো ছিঁড়ে ফেলে। এরপর লাঠি ও রড দিয়ে বেধড়ক মারধর করা হয় তাদের। এই হামলায় এজাজের বাম হাত ভেঙে যায় এবং কাবের শেখ ও রাশেদ শেখ নামে আরও দুই কর্মী মারাত্মক আহত হন। ওড়িশায় চিকিৎসা না পেয়ে তারা কোনোমতে ট্রেনে করে ধুলিয়ানে ফিরে এসেছেন। বর্তমানে কর্মহীন ও পঙ্গু অবস্থায় স্ত্রী-সন্তান নিয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন এজাজ।
অনুরূপ ভয়াবহ অভিজ্ঞতা হয়েছে ছত্তিশগড়ের নারায়ণপুরে। মুর্শিদাবাদের সাগরদিঘি এলাকার বাসিন্দা ইয়াদুল শেখ, নিয়ামত শেখ এবং ৬৫ বছরের বৃদ্ধ হানিফ শেখ মোটরসাইকেলে করে কম্বল ফেরি করতে গিয়েছিলেন। ছত্তিশগড়ে পৌঁছানোর পর গেরুয়া বাহিনীর সদস্যরা তাদের আটকে পরিচয়পত্র দেখতে চায়। মুসলিম নাম দেখে তাদের ওপর শুরু হয় পৈশাচিক নির্যাতন। ইয়াদুল ও নিয়ামতকে একটি বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে বেঁধে তাদের শরীরে পেট্রোল ঢেলে আগুন দেওয়ার চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। পরে কোনোভাবে তারা প্রাণে রক্ষা পেলেও নিজেদের সর্বস্ব হারিয়েছেন। হামলাকারীরা তাদের কাছে থাকা নগদ টাকা ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিয়েছে।
২০২৫ সাল জুড়েই ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে মুসলিম নির্যাতনের প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমবঙ্গ থেকে যাওয়া শ্রমিকদের টার্গেট করে এই ‘বাংলাদেশি’ বিদ্বেষ ছড়িয়ে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার চেষ্টা করা হচ্ছে।
নির্যাতনের শিকার এই শ্রমিকরা জানান, পশ্চিমবঙ্গে দৈনিক মজুরি ৪শ টাকা হলেও বাইরে ১ হাজার টাকা পাওয়া যায় বলেই তারা ঝুঁকি নিয়ে অন্য রাজ্যে যান। কিন্তু বর্তমানে জীবনের নিরাপত্তার অভাব তাদের নিজ রাজ্যে ফিরে আসতে বাধ্য করছে। বারবার এমন ঘটনা ঘটলেও বিজেপিশাসিত ওইসব রাজ্যের পুলিশ বা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় স্থানীয় মুসলিমদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা কাজ করছে।
















