মাদুরোকে ‘বড় ভাই’ বলা শি জিনপিং এখন হিসাব কষছেন দক্ষিণ আমেরিকায় প্রভাব রক্ষার; তেল নিয়ে ট্রাম্পের পদক্ষেপে চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে নতুন মোড়
ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের আকস্মিক সামরিক অভিযান কেবল একটি দেশের শাসনব্যবস্থায় ধস নামায়নি, বরং কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে বড় ধরনের সংকটে ফেলেছে বেইজিংয়ের দীর্ঘদিনের ভূ-রাজনৈতিক কৌশলকে। গত শনিবার (৩ জানুয়ারি) মার্কিন বাহিনীর বিশেষ অভিযানে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো আটক হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে তিনি বেইজিংয়ের দূতদের সঙ্গে বৈঠকে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে ‘বড় ভাই’ হিসেবে সম্বোধন করেছিলেন। কিন্তু সেই ‘ভ্রাতৃত্বের’ বন্ধন এখন ট্রাম্পের ‘অপারেশন অ্যাবসলিউট রিজলভ’-এর ধাক্কায় খাদের কিনারে। তেলসমৃদ্ধ ভেনেজুয়েলায় গত কয়েক দশকে কয়েক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে চীন।
দক্ষিণ আমেরিকায় বেইজিংয়ের অন্যতম বিশ্বস্ত মিত্র হিসেবে পরিচিত মাদুরো সরকারের সঙ্গে চীনের প্রায় ৬০০টি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি রয়েছে। ভেনেজুয়েলার মোট তেল রপ্তানির প্রায় ৮০ শতাংশই যায় চীনে, যা বেইজিংয়ের মোট জ্বালানি আমদানির ৪ শতাংশ। তবে ট্রাম্পের এই অভিযানের পর ভেনেজুয়েলার তেল সম্পদ এখন কার্যত ওয়াশিংটনের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। ট্রাম্প ইতিমধ্যে ঘোষণা করেছেন যে, ভেনেজুয়েলার ৩ থেকে ৫ কোটি ব্যারেল তেল যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে এবং এর অর্থ নিয়ন্ত্রণ করবেন তিনি নিজেই। বিশ্লেষকদের মতে, এটি চীনের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য একটি কৌশলগত পরাজয় হতে পারে।
মাদুরোকে মার্কিন যুদ্ধজাহাজে চোখ বাঁধা ও হাতকড়া পরা অবস্থায় দেখার পর চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে ব্যাপক আলোড়ন তৈরি হয়েছে। চীনের অনেক নাগরিক ও জাতীয়তাবাদী বিশ্লেষক প্রশ্ন তুলছেন—যুক্তরাষ্ট্র যদি তাদের ‘পেছনের উঠানের’ কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের নেতাকে এভাবে ধরে নিয়ে যেতে পারে, তবে চীন কেন তাইওয়ানের ক্ষেত্রে একই পথ অনুসরণ করবে না? চীন বরাবরই তাইওয়ানকে নিজেদের অবিচ্ছেদ্য অংশ মনে করে।
যদিও বিশ্লেষক ডেভিড স্যাকস মনে করেন, ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ চীনকে তাইওয়ানে হামলার জন্য ‘সবুজ সংকেত’ দেবে না, তবে এটি বেইজিংয়ের এই বিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করবে যে, বর্তমান আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন আসলে মার্কিন আধিপত্য রক্ষার একটি আবরণ মাত্র। ভেনেজুয়েলায় মার্কিন অভিযানের তীব্র নিন্দা জানিয়ে চীন একে ‘আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন’ বলে অভিহিত করেছে। বেইজিংয়ের মতে, ওয়াশিংটন ‘বিশ্বের বিচারক’ সেজে অন্য দেশের সার্বভৌমত্ব নষ্ট করছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, এই অঞ্চলে তারা কোনো প্রতিপক্ষের ঘাঁটি হতে দেবেন না—যা মূলত বেইজিংয়ের প্রতি একটি প্রচ্ছন্ন হুমকি।
ট্রাম্পের মতো খামখেয়ালি নেতার অধীনে চীন এখন একদিকে যুক্তরাষ্ট্রে তাদের বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষা এবং অন্যদিকে লাতিন আমেরিকায় নিজেদের প্রভাব টিকিয়ে রাখার কঠিন সমীকরণের মুখোমুখি। ভেনেজুয়েলার অবকাঠামো বর্তমানে অনেকটা ধ্বংসপ্রাপ্ত হলেও ট্রাম্প সেখানে মার্কিন কোম্পানিগুলোকে বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়ার কথা ভাবছেন। এর ফলে বেইজিংয়ের দেওয়া বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ঋণ পরিশোধের বিষয়টি এখন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। চীনের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো—যুদ্ধ বা বড় কোনো দ্বন্দ্বে না জড়িয়ে কীভাবে ট্রাম্পের এই ‘বিশৃঙ্খলা’ মোকাবিলা করে নিজেদের বৈশ্বিক স্বার্থ রক্ষা করা যায়। দীর্ঘমেয়াদি কৌশলে বিশ্বাসী বেইজিং এই অনিশ্চয়তা পছন্দ না করলেও ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে তারা বারবার এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছে।
















