৫ দিনব্যাপী গোপন বৈঠকে অংশ নেন আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা; শুটার ফয়সালের অ্যাকাউন্টে মিলেছে ৫৫ লাখ টাকা
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে পতিত আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা ও সাবেক মন্ত্রীদের সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ পেয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, এই হত্যাকাণ্ডের পূর্ণাঙ্গ নীল নকশা তৈরি হয়েছিল দেশের বাইরে সিঙ্গাপুরে বসে। ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানকসহ একাধিক প্রভাবশালী নেতা ও ক্যাডার। দীর্ঘ তদন্ত শেষে ১৭ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেছে ডিবি।
তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, গত বছরের ২১ জুলাই শুটার ফয়সাল করিম মাসুদকে বিশেষ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয়। সেখানে ২২ জুলাই সন্ধ্যায় সিঙ্গাপুর-মালয়েশিয়া সীমান্তবর্তী একটি অভিজাত হোটেলে জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাবেক এমপি ইলিয়াস মোল্লা এবং ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক কাউন্সিলর তাইজুল ইসলাম চৌধুরী ওরফে বাপ্পীর সঙ্গে তার গোপন বৈঠক হয়। ডিবির তথ্যমতে, টানা ৫ দিনব্যাপী চলা ওই বৈঠকে হাদিকে হত্যার চূড়ান্ত রূপরেখা, অর্থের লেনদেন এবং খুনের পর আসামিদের নিরাপদে দেশের বাইরে পাঠানোর পথ নির্ধারণ করা হয়। ২৬ জুলাই দেশে ফেরার পরপরই ফয়সালের সন্তানের নামে একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ৫৫ লাখ টাকার ফিক্সড ডিপোজিট (এফডি) খোলার তথ্য পায় তদন্তকারী দল। এই অর্থ হত্যাকাণ্ডের ‘পারিশ্রমিক’ এবং পরবর্তী নিরাপত্তা ব্যয়ের অংশ হিসেবে প্রদান করা হয়েছিল বলে ডিবি নিশ্চিত করেছে।
ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম জানান, মিরপুর এলাকার সাবেক কাউন্সিলর বাপ্পীর সরাসরি নির্দেশনা ও নিবিড় পরিকল্পনায় এই হত্যাকাণ্ড বাস্তবায়িত হয়। শরিফ ওসমান হাদি তার ধারালো বক্তৃতার মাধ্যমে আওয়ামী লীগ, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ এবং তৎকালীন সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। তার নতুন ধরনের রাজনীতি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া সত্য ও সমালোচনামূলক বক্তব্যগুলো ক্ষমতাসীনদের জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। মূলত হাদির এই সাহসী কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করে দিতেই আওয়ামী লীগের উচ্চপর্যায়ের নেতাদের নির্দেশে কাউন্সিলর বাপ্পী শুটার ফয়সালকে হত্যার দায়িত্ব দেন। হাদিকে সরাসরি তিনটি গুলি করেন ছাত্রলীগের সাবেক নেতা ফয়সাল করিম মাসুদ, যাকে মোটরসাইকেলে চড়ে সহযোগিতা করেন আদাবর থানা যুবলীগের কর্মী আলমগীর হোসেন শেখ। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত উদ্ধারকৃত অস্ত্রের ব্যালিস্টিক পরীক্ষার ফলাফলও ‘পজিটিভ’ এসেছে।
এই আলোচিত হত্যা মামলায় মোট ১৭ জনের বিরুদ্ধে বিস্তারিত অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে। ডিবির ভাষ্য অনুযায়ী, মূল পরিকল্পনাকারী বাপ্পী, শুটার ফয়সাল এবং তার সহযোগী আলমগীর বর্তমানে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে পলাতক রয়েছেন। তবে ফয়সালের পুরো পরিবারকে এই খুনের প্রক্রিয়ায় সহায়তার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে। ফয়সালের বাবা হুমায়ুন কবির হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত মোটরসাইকেলের নম্বর প্লেট পরিবর্তন ও অস্ত্র স্থানান্তরের কাজে যুক্ত ছিলেন। তার মা হাসি বেগম ও বোন জেসমিন আক্তার খুনিদের আশ্রয় দেওয়া এবং অস্ত্র সংরক্ষণে সরাসরি ভূমিকা রাখেন। এছাড়া ফিলিপ স্নাল ও মুক্তি মাহমুদসহ আরও কয়েকজন আসামিকে হালুয়াঘাট সীমান্ত দিয়ে পালিয়ে যেতে সহায়তা করেছেন বলে চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়েছে। ইনকিলাব মঞ্চ অবশ্য এই চার্জশিটকে ‘কাগুজে’ আখ্যা দিয়ে প্রকৃত নেপথ্য কারিগরদের আড়াল করার অভিযোগ তুলেছে।
















