বাংলাদেশে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে জোরপূর্বক গুমের শিকার মানুষের সংখ্যা চার হাজার থেকে ছয় হাজারের মধ্যে হতে পারে বলে জানিয়েছে গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশন। রোববার প্রকাশিত কমিশনের এক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, কমিশনের কাছে মোট এক হাজার ৯১৩টি গুম সংক্রান্ত অভিযোগ জমা পড়েছে। যাচাই বাছাই শেষে এর মধ্যে এক হাজার ৫৬৯টি ঘটনাকে গুম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব ঘটনার মধ্যে ২৮৭টি অভিযোগ এমন শ্রেণিতে পড়েছে, যেখানে নিখোঁজ ব্যক্তিকে মৃত হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
এই প্রতিবেদনটি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন। তবে কমিশনের সদস্য নাবিলা ইদ্রিস বলেন, প্রকৃত গুমের সংখ্যা সরকারি নথিভুক্ত ঘটনার চেয়েও অনেক বেশি হতে পারে।
তিনি জানান, অনেক ভুক্তভোগী বা তাদের পরিবার কমিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি। কেউ কমিশনের কার্যক্রম সম্পর্কে জানেন না, কেউ দেশ ছেড়ে চলে গেছেন, আবার অনেকেই ভয় বা অনিচ্ছার কারণে প্রকাশ্যে কথা বলতে রাজি হননি। এসব কারণে মোট গুমের সংখ্যা চার হাজার থেকে ছয় হাজারে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কমিশনের তথ্যে দেখা গেছে, যেসব ব্যক্তি গুম হওয়ার পর জীবিত ফিরে এসেছেন, তাদের মধ্যে প্রায় ৭৫ শতাংশ জামায়াতে ইসলামীর সদস্য এবং ২২ শতাংশ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির সদস্য বা নেতা। আর যারা এখনো নিখোঁজ রয়েছেন, তাদের মধ্যে ৬৮ শতাংশ বিএনপি ও তাদের সহযোগী সংগঠনের নেতা কর্মী এবং ২২ শতাংশ জামায়াতপন্থী বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কমিশনের দাবি, গুমের পেছনে মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কাজ করেছে। এতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার প্রতিরক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা তারেক আহমেদ সিদ্দিকী এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সংশ্লিষ্টতার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিএনপির নেতা ইলিয়াস আলী, হুম্মাম কাদের চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমেদ ও চৌধুরী আলম এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতা আব্দুল্লাহিল আমান আজমী, মীর আহমদ বিন কাসেম ও মারুফ জামানকে গুম করার নির্দেশ শেখ হাসিনা দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলন দমনে নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর অভিযানে শত শত মানুষ নিহত হওয়ার ঘটনায় শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান। এর কয়েক মাস পর গত নভেম্বরে তাকে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ইউনূস তদন্ত কমিশনের কাজকে ঐতিহাসিক উল্লেখ করে সদস্যদের ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, এই প্রতিবেদন দেখিয়ে দেয় কীভাবে গণতন্ত্রের নামে দেশের সব প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করে মানুষের ওপর ভয়াবহ নির্যাতন চালানো হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, যারা এসব ভয়ঙ্কর ঘটনার সঙ্গে জড়িত, তারা আমাদেরই সমাজের মানুষ এবং স্বাভাবিক জীবন যাপন করছে। একটি জাতি হিসেবে আমাদের এই নির্মম অধ্যায় থেকে বেরিয়ে আসতে হবে এবং ভবিষ্যতে যেন এমন ঘটনা আর কখনো না ঘটে, সে জন্য স্থায়ী সমাধান খুঁজে বের করতে হবে।
গত মাসের শেষ দিকে দেশের রাজনীতিতে আরেকটি যুগের অবসান ঘটে। বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে আসে। তার মৃত্যুর পর এখন আলোচনায় রয়েছে, তার ছেলে তারেক রহমান ভবিষ্যতে মায়ের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার কতটা এগিয়ে নিতে পারবেন।















