আন্তর্জাতিক সম্মেলন ও উদ্যোগের পরও মেলেনি সমাধান; মাদক ও নিরাপত্তা ঝুঁকিতে সীমান্তবর্তী জনপদ
দীর্ঘ দেড় বছর ধরে দুই প্রতিবেশী ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্কের এক জটিল টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। বিশেষ করে মিয়ানমারের জাতিগত সহিংসতা এবং এর ফলে সৃষ্ট রোহিঙ্গা সংকট বর্তমানে বাংলাদেশের জন্য কেবল মানবিক নয়, বরং একটি চরম নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর রোহিঙ্গাদের মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের বিষয়ে আন্তর্জাতিক মহলে জোর তৎপরতা চালালেও বাস্তবে এর কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। উল্টো আন্তর্জাতিক সহায়তা আশঙ্কাজনক হারে কমে যাওয়ায় বাংলাদেশের ওপর বাড়তি অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে গত বছর জাতিসংঘ, কাতার ও বাংলাদেশে তিনটি বড় ধরনের আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস এসব সম্মেলনে রোহিঙ্গা ইস্যুকে বৈশ্বিক দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। পশ্চিমা বিশ্বের ১১টি দেশও রোহিঙ্গাদের রাখাইনে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘ আট বছর পার হলেও এসব আশ্বাসের ফলাফল এখন পর্যন্ত শূন্য। মিয়ানমারের অভ্যন্তরে আরাকান আর্মি ও রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে চলমান সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের বান্দরবান ও কক্সবাজার জেলায়।
সাম্প্রতিক সময়ে নাফ নদ ও সীমান্ত অঞ্চলগুলো বাংলাদেশের জন্য মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির আগ্রাসনে টেকনাফ ও সেন্ট মার্টিন এলাকার জেলেরা অপহরণ ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। সীমান্তরেখার অস্পষ্টতার সুযোগ নিয়ে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো বাংলাদেশি নাগরিকদের তুলে নিয়ে যাচ্ছে, যা সীমান্তবর্তী পরিবারগুলোতে কান্নার রোল সৃষ্টি করেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাত সামাল দিতে ব্যর্থ হলে এটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য দীর্ঘমেয়াদি হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। এমনকি মিয়ানমারের এই যুদ্ধ সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
রোহিঙ্গা সংকটের সমান্তরালে মাদক চোরাচালান এখন দেশের জন্য অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ। শরণার্থী শিবিরের বিশাল জনজট এবং সীমান্তের জটিল ভূপ্রকৃতিকে ব্যবহার করে মাদক কারবারিরা ইয়াবা, আইস ও সিনথেটিক ড্রাগের নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। মাদক ও রোহিঙ্গা ইস্যু এখন একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত হয়ে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও সামাজিক স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলছে। যদিও সরকার বিভিন্ন সময় নানা উদ্যোগের কথা জানিয়েছে, তবে বর্তমানে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বা সীমান্ত সুরক্ষায় কার্যকর কোনো দিশা মিলছে না। এমতাবস্থায় একটি নির্বাচিত সরকার এই বহুমাত্রিক সংকট মোকাবিলায় কী ভূমিকা রাখে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
















