ইরানে টানা এক সপ্তাহ ধরে চলা সরকারবিরোধী বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি বলেছেন, দাঙ্গাকারীদের অবশ্যই তাদের জায়গায় রাখা হবে। শনিবার দেওয়া এই মন্তব্যে তিনি বিক্ষোভকারী ও দাঙ্গাকারীদের মধ্যে পার্থক্য টানেন এবং বলেন, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকারীদের সঙ্গে কথা বলা উচিত, কিন্তু দাঙ্গাকারীদের সঙ্গে আলোচনার কোনো অর্থ নেই।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত বক্তব্যে ৮৬ বছর বয়সী খামেনি বলেন, কর্মকর্তাদের উচিত প্রকৃত বিক্ষোভকারীদের কথা শোনা। তবে যারা সহিংসতায় জড়াচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। গত এক সপ্তাহে ইরানের দুর্বল অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিক্ষোভে অন্তত ১০ জন নিহত হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
এই বিক্ষোভ থামার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। এর মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, যদি তেহরান শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের সহিংসভাবে দমন করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র তাদের রক্ষায় এগিয়ে আসবে। তবে ট্রাম্প কীভাবে বা আদৌ হস্তক্ষেপ করবেন কিনা, তা স্পষ্ট নয়। বিশেষ করে ভেনেজুয়েলায় সাম্প্রতিক মার্কিন সামরিক অভিযানের পর তার মন্তব্য ইরান সরকারের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে।
জাতিসংঘে ইরানের রাষ্ট্রদূত আমির সাঈদ ইরাভানি জাতিসংঘের মহাসচিব ও নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতিকে চিঠি দিয়ে ট্রাম্পের মন্তব্যকে বেআইনি হুমকি হিসেবে আখ্যা দিয়ে এর নিন্দা জানানোর আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব আলি লারিজানি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ পুরো অঞ্চলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে এবং এতে মার্কিন স্বার্থই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে যে ব্যাপক আন্দোলন হয়েছিল, বর্তমান বিক্ষোভ এখনো সেই মাত্রায় পৌঁছায়নি। তবে এটি সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে অন্যতম বড় প্রতিবাদ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
খামেনি তার বক্তব্যে আবারও অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলসহ বিদেশি শক্তি এসব বিক্ষোভ উসকে দিচ্ছে। কোনো প্রমাণ না দিলেও তিনি ইরানের মুদ্রা রিয়ালের অবমূল্যায়নের জন্যও শত্রুপক্ষকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, শত্রুরা কিছু লোককে প্ররোচিত বা ভাড়া করে ব্যবসায়ী ও দোকানিদের পেছনে লাগাচ্ছে এবং ইসলাম, ইরান ও ইসলামী প্রজাতন্ত্রবিরোধী স্লোগান দিচ্ছে।
একই বক্তব্যে খামেনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে মধ্যপ্রাচ্য ছেড়ে যেতেই হবে এবং যাবে। তার ভাষায়, এই অঞ্চলের জনগণের দৃঢ় সংকল্পের মাধ্যমে আমেরিকা একদিন বাধ্য হয়ে অঞ্চলটি ত্যাগ করবে।
এদিকে ইরানের সংস্কারপন্থী প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের নেতৃত্বাধীন বেসামরিক সরকার বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আলোচনার ইঙ্গিত দিয়েছে। তবে তিনি স্বীকার করেছেন, রিয়ালের দ্রুত অবমূল্যায়ন ঠেকাতে সরকারের হাতে খুব বেশি কিছু করার নেই। এই অর্থনৈতিক সংকট থেকেই মূলত বিক্ষোভের সূত্রপাত।
বিক্ষোভের সময় বিভিন্ন শহরে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এতে কয়েকজন নিহত হয়েছেন এবং বহু মানুষকে আটক করা হয়েছে। জুনে ইসরাইলের সঙ্গে সংঘাত এবং এতে যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণের পর থেকে ইরানের অর্থনীতি আরও চাপে পড়েছে।
সম্প্রতি ইরান দাবি করেছে, তারা দেশের কোথাও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ করছে না, যাতে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার পথ খুলে যায় এবং নিষেধাজ্ঞা শিথিল হয়। তবে এখনো কোনো আলোচনা শুরু হয়নি। এর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল শুধু পারমাণবিক কর্মসূচি নয়, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতেও নজর দিচ্ছে বলে জানা গেছে।
















