ইকোভাস থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর মালি, নাইজার ও বুরকিনা ফাসো সামরিক শাসিত তিন দেশ মিলে গড়ে তুলেছে নতুন আঞ্চলিক জোট অ্যালায়েন্স অব সাহেল স্টেটস বা এইএস। সম্প্রতি মালি রাজধানী বামাকোতে অনুষ্ঠিত জোটের দ্বিতীয় শীর্ষ সম্মেলনে নতুন একটি উন্নয়ন ব্যাংক, একটি টেলিভিশন চ্যানেল এবং যৌথ সামরিক বাহিনী উদ্বোধন করা হয়েছে। এসব পদক্ষেপ সাহেল অঞ্চলের রাজনীতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
২০২০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে পৃথক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা এই তিন দেশের শাসকগোষ্ঠী ফ্রান্সের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনসহ পশ্চিমা উপস্থিতি কমিয়ে দেয়। এরপর ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে তারা একত্র হয়ে এইএস গঠন করে এবং পশ্চিম আফ্রিকার আঞ্চলিক জোট ইকোভাস ত্যাগ করে। তাদের অভিযোগ, ইকোভাস আফ্রিকার স্বার্থের বদলে বিদেশি শক্তির প্রভাবেই বেশি কাজ করছে।
ডিসেম্বরের শেষ দিকে বামাকোয় আয়োজিত এইএস শীর্ষ সম্মেলনে নেতারা সাহেল ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক উদ্বোধন করেন, যার লক্ষ্য পশ্চিমা ঋণদাতাদের ওপর নির্ভর না করে অবকাঠামো ও উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়ন করা। পাশাপাশি একটি যৌথ টেলিভিশন চ্যানেল চালু করা হয়, যা সাহেলের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরবে বলে দাবি করা হয়েছে। একই সঙ্গে সীমান্ত পেরিয়ে সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য একটি যৌথ সামরিক বাহিনী গঠনের ঘোষণাও আসে।
এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছে গভীর নিরাপত্তা সংকট। আল-কায়েদা সংশ্লিষ্ট জঙ্গিগোষ্ঠী জেএনআইএম মালি থেকে ছড়িয়ে পড়েছে আশপাশের দেশগুলোতে এবং সাম্প্রতিক সময়ে বেনিন উপকূল পর্যন্ত হামলা চালিয়েছে। দুর্বল রাষ্ট্রীয় উপস্থিতি ও দীর্ঘদিনের অসন্তোষ কাজে লাগিয়ে এসব গোষ্ঠী শক্তিশালী হচ্ছে। এমন প্রেক্ষাপটে নতুন জোটকে তিন দেশের শাসকরা টিকে থাকার প্রশ্ন হিসেবে দেখছেন।
বামাকোর রাস্তায় সাধারণ মানুষের জীবন আপাতত স্বাভাবিক থাকলেও শহরের চারপাশে জঙ্গি অবরোধ, জ্বালানি সংকট ও পণ্যের ঘাটতি বাস্তবতা হয়ে উঠেছে। অনেকের মধ্যে ক্ষোভের বদলে এক ধরনের উদাসীনতা দেখা যাচ্ছে। গুজব রয়েছে, কখনো কখনো শহর সচল রাখতে কর্তৃপক্ষ নীরব সমঝোতাও করছে।
জোটকে জনপ্রিয় করতে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগও চোখে পড়ছে। নতুন নির্মিত সাহেল অ্যালায়েন্স স্কয়ারে তরুণদের জড়ো করে জোটের দেশ ও নেতাদের নাম শেখানো হচ্ছে, বিতরণ করা হচ্ছে নেতাদের ছবি সংবলিত টি-শার্ট। শিশু-কিশোরদের কাছে এই জোটকে ‘একসঙ্গে হাত ধরার’ প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।
ফ্রান্সের প্রভাব কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়েছে। রুশ ভাড়াটে যোদ্ধাদের সহায়তায় সামরিক অভিযান চলছে। ফরাসি সেনা ও গণমাধ্যম নিষিদ্ধ হওয়ায় একসময় ফ্রাঙ্কোফোন পশ্চিম আফ্রিকার কেন্দ্র বলে পরিচিত মালি এখন ফ্রান্সবিরোধী মনোভাবের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
সমালোচকেরা বলছেন, এই জোট আসলে সামরিক ক্ষমতা আরও কেন্দ্রীভূত করছে, গণমাধ্যম ও নাগরিক পরিসর সংকুচিত হচ্ছে, মানবাধিকার প্রশ্নে জবাবদিহি পিছিয়ে যাচ্ছে। তবে সমর্থকদের মতে, এটি দীর্ঘদিনের নির্ভরশীলতা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা, যেখানে দ্রুত সিদ্ধান্ত ও সার্বভৌমত্বই মুখ্য।
এইএস নেতারা ভবিষ্যতে যৌথ মুদ্রা, নিজস্ব বিচারব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিকল্প ব্যবস্থার কথাও বলছেন। ফলে এটি কেবল একটি সামরিক বা রাজনৈতিক জোট নয়, বরং ইকোভাসের বিকল্প একটি পূর্ণাঙ্গ কাঠামো গড়ে তোলার প্রয়াস হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
জোটের নেতৃত্ব গ্রহণের সময় বুরকিনা ফাসোর প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম ত্রাওরে পশ্চিমা শক্তির পাশাপাশি আফ্রিকার ভেতরের বিভাজনকেও বড় হুমকি হিসেবে তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
সব বিতর্ক ও অনিশ্চয়তার মাঝেও বামাকোর রাস্তায় জীবন চলছেই। সংগীত, বাজার আর দৈনন্দিন ব্যস্ততার ভেতর অনেকেই বলছেন, সাহেল অতীতেও কঠিন সময় পার করেছে। এই সময়ও পার হবে।















