রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধের প্রায় চার বছর পর একটি শান্তি চুক্তি আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় কাছাকাছি বলে দাবি করছে মস্কো ও ওয়াশিংটন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভাষায়, এখনো এক দুইটি অত্যন্ত জটিল ও সংবেদনশীল ইস্যু রয়েছে, যেগুলো সমাধান না হলে পুরো প্রক্রিয়াই ভেস্তে যেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত বিশ দফা শান্তি পরিকল্পনায় সবচেয়ে বড় জটিলতা তৈরি করেছে ইউক্রেনের ভূখণ্ড সংক্রান্ত প্রশ্ন এবং ইউরোপের সবচেয়ে বড় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভবিষ্যৎ। বর্তমানে এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ক্রেমলিন বলছে আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে, আর ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি আগামী ৬ জানুয়ারি ফ্রান্সে ইউরোপীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন। তবে যেকোনো একটি ইস্যু অমীমাংসিত থাকলে চুক্তি ভেঙে পড়তে পারে।
ডনবাস অঞ্চল নিয়ে সবচেয়ে বড় দ্বন্দ্ব
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেনের শিল্পসমৃদ্ধ ডনবাস অঞ্চল পুরোপুরি দখলের দাবিতে অনড় রয়েছেন। পূর্ব ইউক্রেনের লুহানস্ক অঞ্চল প্রায় পুরোপুরি রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে থাকলেও ডোনেৎস্ক অঞ্চলের এক চতুর্থাংশ এখনো ইউক্রেনের হাতে। পুতিন চান স্লোভিয়ানস্ক ও ক্রামাতোরস্কসহ পুরো এলাকাই রাশিয়ার অন্তর্ভুক্ত হোক।
জেলেনস্কি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, আইনের কারণে এবং সেখানে বসবাসকারী প্রায় তিন লাখ মানুষের কথা বিবেচনায় নিয়ে ইউক্রেন ওই অঞ্চল ছেড়ে যেতে পারে না। তবে তিনি একটি আপসের প্রস্তাব দিয়েছেন। তার মতে, উভয় পক্ষ সেনা প্রত্যাহার করলে এলাকাটি নিরস্ত্রীকৃত অঞ্চল বা মুক্ত অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে এবং আন্তর্জাতিক বাহিনী সেখানে নজরদারি করবে।
বিশ্লেষকদের মতে, পুতিন এই প্রস্তাবে সম্মত হবেন এমন সম্ভাবনা কম। রাশিয়ার সামরিক নেতৃত্বও দাবি করছে যে তারা দ্রুত ইউক্রেনের ভূখণ্ড দখল করছে। তবে কিছু পর্যবেক্ষক মনে করেন, বর্তমান গতিতে রুশ বাহিনীর পুরো ডোনেৎস্ক দখল করতে ২০২৭ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত লাগতে পারে।
জাপোরিঝঝিয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভবিষ্যৎ
২০২২ সালের মার্চ থেকে ইউরোপের সবচেয়ে বড় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র জাপোরিঝঝিয়া রাশিয়ার দখলে রয়েছে। এর ছয়টি চুল্লি তিন বছরের বেশি সময় ধরে বন্ধ রয়েছে এবং ইউক্রেনের সরবরাহ করা বিদ্যুতের ওপর নির্ভর করে কেন্দ্রটি নিরাপদ রাখা হচ্ছে। আবার চালু করতে হলে ব্যাপক বিনিয়োগ প্রয়োজন, বিশেষ করে ধ্বংস হয়ে যাওয়া কাখোভকা জলবিদ্যুৎ বাঁধ পুনর্নির্মাণে।
ইউক্রেন চায় এলাকাটি নিরস্ত্রীকরণ করে মুক্ত অর্থনৈতিক অঞ্চলে পরিণত করতে। জেলেনস্কির দাবি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তাব দিয়েছে এই বিদ্যুৎকেন্দ্র রাশিয়া ও ইউক্রেনের সঙ্গে যৌথভাবে পরিচালনার। তবে কিয়েভ বলছে, রাশিয়ার সঙ্গে যৌথ ব্যবস্থাপনা বাস্তবসম্মত নয়। রাশিয়ার পারমাণবিক সংস্থা রোসআতোম আবার জোর দিয়ে বলেছে, শুধুমাত্র রাশিয়াই কেন্দ্রটির নিরাপদ পরিচালনা নিশ্চিত করতে পারে।
বিশ্বাসের অভাবই বড় সমস্যা
শান্তি আলোচনায় সবচেয়ে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে পারস্পরিক অবিশ্বাস। ট্রাম্প সম্প্রতি দাবি করেছেন, পুতিন ইউক্রেনের সাফল্য দেখতে চান এবং সস্তায় জ্বালানি সরবরাহে আগ্রহী। কিন্তু জেলেনস্কি প্রকাশ্যেই বলেছেন, তিনি পুতিন বা রাশিয়ার ওপর আস্থা রাখেন না।
রাশিয়াও ইউক্রেনের ওপর সন্দেহ প্রকাশ করে অভিযোগ করেছে যে ইউক্রেনীয় ড্রোন পুতিনের একটি আবাসিক এলাকাকে লক্ষ্যবস্তু করেছে, যদিও এর কোনো প্রমাণ দেওয়া হয়নি। ইউক্রেন এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং একে ভবিষ্যৎ হামলার অজুহাত বলে মনে করছে।
আরও যেসব বিষয় বাধা হয়ে আছে
ইউক্রেন ন্যাটোর মতো নিরাপত্তা নিশ্চয়তা চাইছে, যাতে ভবিষ্যতে রাশিয়া আবার হামলা করলে আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া নিশ্চিত হয়। পাশাপাশি তারা আট লাখ সদস্যের শক্তিশালী সেনাবাহিনী বজায় রাখতে চায়। রাশিয়া ইউক্রেনে ইউরোপীয় সেনা মোতায়েনের বিরোধিতা করছে এবং ইউক্রেনের ন্যাটো সদস্যপদ চেষ্টাও প্রত্যাখ্যান করেছে।
যুদ্ধের ফলে ইউক্রেনের ক্ষতির পরিমাণ আনুমানিক আটশ বিলিয়ন ডলার। এই ক্ষতিপূরণে রাশিয়ার ভূমিকা কী হবে, সেটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। ইউরোপে রাশিয়ার বিপুল সম্পদ জব্দ রয়েছে, যা নিয়ে আলোচনা চলছে।
গণভোটের প্রশ্ন
জেলেনস্কি বলছেন, জরিপ অনুযায়ী অধিকাংশ ইউক্রেনীয় শান্তি চান, তবে একই সঙ্গে ডনবাস ছাড়ার বিরোধিতা করেন। তাই তার মতে, ডোনেৎস্কের ভবিষ্যৎ বা শান্তি পরিকল্পনা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হলে গণভোট প্রয়োজন এবং তার আগে অন্তত ষাট দিনের যুদ্ধবিরতি দরকার।
ক্রেমলিনের দাবি, সাময়িক যুদ্ধবিরতি সংঘাতকে দীর্ঘায়িত করবে। ট্রাম্পও রাশিয়ার এই অবস্থান কিছুটা বুঝতে পারছেন বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে জেলেনস্কির মতে, গণভোট ছাড়া যেকোনো চুক্তি বৈধতা হারাবে। ফলে শান্তির পথে এসব কঠিন প্রশ্নই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
















