মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিশ্চিত করেছেন যে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী ভেনেজুয়েলার ভেতরে স্থলভিত্তিক হামলা চালিয়েছে। এটি ভেনেজুয়েলার ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম সরাসরি স্থল হামলা, যা ওয়াশিংটন ও কারাকাসের মধ্যকার উত্তেজনা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে।
সোমবার দেওয়া এক বক্তব্যে ট্রাম্প বলেন, অভিযানে এমন একটি ডক লক্ষ্য করা হয়েছে, যেখানে নাকি মাদক বহনকারী নৌযানগুলোতে মাল তোলা হতো। তিনি দাবি করেন, ওই স্থানে বড় ধরনের বিস্ফোরণ ঘটেছে এবং এটিকে মাদক পাচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে উল্লেখ করেন। তবে ভেনেজুয়েলার কর্তৃপক্ষ এখনো এই ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেনি এবং স্বাধীনভাবে এর কোনো প্রমাণও মেলেনি।
এই ঘোষণা এমন এক সময়ে এসেছে, যখন দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা দ্রুত বেড়ে চলেছে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর থেকে ট্রাম্প প্রশাসন ক্যারিবীয় সাগর ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে ভেনেজুয়েলার বিভিন্ন নৌযানের বিরুদ্ধে একাধিক সামরিক অভিযান চালিয়ে আসছে। ওয়াশিংটনের দাবি, এসব অভিযান মাদক পাচার ঠেকানোর উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে, যদিও এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।
মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দুই ডজনের বেশি নৌযান লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে, যাতে শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। পাশাপাশি, নিষেধাজ্ঞাভুক্ত তেল পরিবহনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার তেল ট্যাংকার জব্দ করেছে এবং দেশটির উপকূলের কাছে আংশিক নৌ অবরোধ আরোপ করেছে।
কারাকাস বারবার যুক্তরাষ্ট্রের এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। ভেনেজুয়েলার সরকারের অভিযোগ, মাদক পাচারের অজুহাত ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র দেশটির সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন করতে এবং সরকার পরিবর্তনের পথ তৈরি করতে চাইছে। তাদের মতে, এসব পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন এবং অবৈধ আগ্রাসনের শামিল।
আইন বিশেষজ্ঞরাও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, আন্তর্জাতিক জলসীমায় নৌযানে হামলা এবং ভেনেজুয়েলার ভূখণ্ডে আঘাত হানা যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন হতে পারে। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা ইতোমধ্যেই আংশিক নৌ অবরোধের নিন্দা জানিয়ে এটিকে অবৈধ বলে আখ্যা দিয়েছেন এবং মার্কিন কংগ্রেসকে হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন।
দুই দেশের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই উত্তেজনাপূর্ণ, তবে ভেনেজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট হুগো চাভেজ তেল শিল্প জাতীয়করণের উদ্যোগ নেওয়ার পর পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর আমলে ২০১৭ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত তেল নিষেধাজ্ঞা ভেনেজুয়েলার তেল রপ্তানি ও আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজারে প্রবেশ মারাত্মকভাবে সীমিত করে দেয়।
বিশ্লেষকদের মতে, সর্বশেষ এই হামলা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলতে পারে অথবা শক্তি প্রদর্শনের পর উত্তেজনা কমানোর কৌশল হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে। কেউ কেউ মনে করছেন, রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের জন্য ট্রাম্প শক্ত অবস্থান দেখাতে চাইছেন। আবার অন্যরা সতর্ক করে বলছেন, এটি একটি বড় ধরনের সামরিক সংঘাতের দিকে বিপজ্জনক অগ্রগতি।
যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও এই অভিযানের বৈধতা ও প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। যদিও সংবিধান অনুযায়ী যুদ্ধ ঘোষণা করার ক্ষমতা কংগ্রেসের হাতে, তবে কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ ঠেকানোর সাম্প্রতিক উদ্যোগ অল্প ব্যবধানে ব্যর্থ হয়েছে।
এখনো পর্যন্ত ভেনেজুয়েলা ট্রাম্পের বক্তব্যের আনুষ্ঠানিক কোনো জবাব দেয়নি। পরিস্থিতি অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ রয়েছে এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের আশঙ্কা, ধারাবাহিক সামরিক তৎপরতা দুই দেশের মধ্যে আরও বড় সংঘাতে রূপ নিতে পারে।
















