বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ আর্থিক সংকট কাটিয়ে উঠতে লেবাননের মন্ত্রিসভা একটি খসড়া আইন অনুমোদন করেছে, যা গ্যাপ আইন নামে পরিচিত। এই আইনের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকে আটকে থাকা আমানতকারীদের অর্থের একটি অংশ ফেরত দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী নওয়াফ সালাম ও রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের পর আইনটি সংসদে আলোচনার জন্য পাঠানো হবে।
২০১৯ সালে লেবাননের মুদ্রা ব্যাপকভাবে অবমূল্যায়িত হতে শুরু করে। তখন ব্যাংকগুলো কার্যত বন্ধ হয়ে যায় এবং সাধারণ মানুষ নিজেদের জমা অর্থ তুলতে না পেরে চরম দুর্ভোগে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে আমানতকারীদের নিজ অর্থ তুলতে ব্যাংকে বিক্ষোভ ও চরম পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়। পরে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলেও লেবানিজ লিরার মূল্য প্রায় ৯৮ শতাংশ কমে যায়।
নতুন গ্যাপ আইনের ইতিবাচক দিক হিসেবে বলা হচ্ছে, এতে আমানতকারীরা অন্তত কিছু অর্থ ফেরত পাবেন। খসড়া অনুযায়ী, যাঁরা সর্বোচ্চ এক লাখ ডলার জমা রেখেছিলেন, তাঁরা চার বছরের মধ্যে পুরো অর্থ ফেরত পাবেন। আগের প্রস্তাবগুলোর তুলনায় এটি দ্রুত সময়সীমা হলেও ২০২০ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী হাসান দিয়াবের সরকারের প্রস্তাবে পাঁচ লাখ ডলার পর্যন্ত ফেরতের কথা ছিল।
প্রধানমন্ত্রী নওয়াফ সালাম জানিয়েছেন, এই আইনের আওতায় পূর্ণাঙ্গ আর্থিক নিরীক্ষা চালানো হবে। এতে ব্যাংকগুলোর লভ্যাংশ, নির্বাহী বোনাস এবং আর্থিক লেনদেনের প্রকৃত চিত্র প্রকাশ পাবে। আমানতকারীদের সংগঠনের সদস্য ও আইনজীবী ফুয়াদ দেবস বলেন, এই নিরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ব্যাংক ও রাষ্ট্রের দাবির মধ্যে বড় ধরনের অসংগতি রয়েছে।
তবে আইনটির নানা নেতিবাচক দিকও রয়েছে। এক লাখ ডলারের সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে একজন আমানতকারীর জন্য, একাধিক হিসাবের জন্য নয়। ফলে কারও একাধিক হিসাবে মোট জমা অর্থ এক লাখ ডলারের বেশি হলেও তিনি সর্বোচ্চ এক লাখ ডলারই নগদে পাবেন। এর বেশি অর্থ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গ্যারান্টিযুক্ত বন্ডের মাধ্যমে পরিশোধ করা হবে।
সমালোচকদের মতে, এই খসড়া আইনে ব্যাংক, ব্যাংকার এবং তাঁদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রাজনীতিকরা তুলনামূলকভাবে কম দায় বহন করছেন, অথচ রাষ্ট্রকে বড় অঙ্কের দায় নিতে হচ্ছে। খসড়া অনুযায়ী, ব্যাংকগুলো আমানত ফেরতের মাত্র ৪০ শতাংশ বহন করবে, যদিও সংকট তৈরিতে তাদের ভূমিকা ছিল বড়।
সংকট চলাকালেও অনেক ব্যাংক শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের বোনাস দিয়েছে, অথচ সাধারণ আমানতকারীরা দৈনন্দিন খরচের জন্যও নিজেদের অর্থ তুলতে পারেননি। দেবস বলেন, ক্ষতির দায় আমানতকারীদের ওপর চাপানো অনুচিত।
বর্তমান হিসাব অনুযায়ী, ব্যাংকগুলোর কাছে আমানতকারীদের পাওনা ও পরিশোধ সক্ষমতার মধ্যে প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলারের ঘাটতি রয়েছে। এই ঘাটতি পূরণে রাষ্ট্রকে এগিয়ে আসতে হবে। ব্যাংকারদের দাবি, তারা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে রাষ্ট্রকে অর্থ দিয়েছিল, তাই দায় রাষ্ট্রেরই। তবে সমালোচকদের বক্তব্য, আমানতকারীদের অনুমতি ছাড়াই ব্যাংকগুলো সেই অর্থ কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা রেখেছিল।
রাষ্ট্রীয় তহবিল ও সম্পদের বিপরীতে ইস্যু করা বন্ডের মাধ্যমে এই অর্থ পরিশোধের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে লেবাননের স্বর্ণভাণ্ডারসহ রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবহারের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সমালোচকরা বলছেন, এতে বিদেশি ভেঞ্চার ফান্ড বা বড় আমানতকারীরা লাভবান হতে পারে, অথচ পুরো দেশের জনগণকে তার মূল্য দিতে হবে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমী অবস্থান নিয়েছে। আইএমএফ বলছে, ব্যাংকারদের আগে আমানতকারীদের ক্ষতির বোঝা চাপানো ঠিক নয়। দেবসের মতে, এই অবস্থান লেবাননের ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর লোভ ও নির্মমতার দিকটি স্পষ্ট করে তুলেছে।
















