পালমিরার মরুভূমিতে রক্ত ঝরার সেই দিনটি সিরিয়ার নতুন অধ্যায়ে এক গভীর শঙ্কার রেখা এঁকে দিয়েছে। ১৩ ডিসেম্বর, মধ্য সিরিয়ার প্রাচীন নগর পালমিরার কাছে যুক্তরাষ্ট্র ও সিরিয়ার যৌথ টহল দলের ওপর আচমকা গুলি চালায় এক হামলাকারী। নিহত হন দুই মার্কিন সেনা ও একজন দোভাষী, আহত হন আরও চারজন। পরে সিরিয়ার নিরাপত্তা বাহিনী হামলাকারীকে হত্যা করে।
ঘটনার পরপরই ওয়াশিংটন ও দামেস্কের কর্মকর্তারা হামলাকারীর সঙ্গে আইএসআইএলের সংশ্লিষ্টতার কথা জানান। প্রতিশোধের কথাও উচ্চারিত হয়। এই রক্তাক্ত ঘটনা সামনে এনে দিয়েছে এক বাস্তবতা, আইএসআইএলের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও সিরিয়ার সহযোগিতা যতই গভীর হোক, সেই পথ এখনো বিপদসংকুল।
নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দেওয়ার পর সিরিয়া সক্রিয়ভাবে আইএসআইএলের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, হামলাকারী সত্যিই আইএসআইএলের সদস্য কি না তা এখনো নিশ্চিত নয়। তবে এতে দুই দেশের নিরাপত্তা সহযোগিতার গুরুত্ব ও ঝুঁকি দুটোই স্পষ্ট হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান সিরীয় নেতৃত্ব আইএসআইএলের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল শারার নেতৃত্বাধীন প্রশাসন আগেও উত্তর-পশ্চিম ইদলিবে আইএসআইএলের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছিল। এখন সেই নীতিরই ধারাবাহিকতা দেখা যাচ্ছে রাষ্ট্র পরিচালনায়।
সিরিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, হামলাকারীর সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর কোনো সরাসরি কমান্ড কাঠামোর যোগ ছিল না। তদন্ত চলছে, সে আইএসআইএলের সঙ্গে যুক্ত ছিল নাকি উগ্র মতাদর্শে প্রভাবিত হয়েছিল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এক সময় পালমিরা ছিল আইএসআইএলের শক্ত ঘাঁটি। ২০১৫ সালে শহরটি দখলের পর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল ইতিহাসের অমূল্য নিদর্শন। ২০১৭ সালে আইএসআইএলকে সেখান থেকে বিতাড়িত করা হলেও, মরুভূমির অন্ধকারে লুকিয়ে থাকা যোদ্ধারা মাঝে মাঝে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বাশার আল আসাদের শাসন পতনের পর বিশৃঙ্খলার সুযোগ নিতে চেয়েছিল আইএসআইএল। দামেস্কে একটি গির্জায় ভয়াবহ হামলার ঘটনাও সেই আশঙ্কা জোরালো করে। যদিও হামলার দায় স্বীকার করেছিল অন্য একটি গোষ্ঠী, আইএসআইএলের ছায়া সেখানে স্পষ্ট ছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরাক ও সিরিয়ায় আইএসআইএলের যোদ্ধা সংখ্যা এখনো তিন থেকে পাঁচ হাজারের মধ্যে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা তথ্যের সহায়তায় সিরিয়ার নিরাপত্তা বাহিনী একাধিক হামলা আগেভাগেই ঠেকাতে পেরেছে। এর ফলেই গত এক বছরে আইএসআইএলের হামলা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০২৪ সালে যেখানে মাসে গড়ে ৬৩টি হামলা হয়েছিল, ২০২৫ সালে তা নেমে এসেছে প্রায় ১০টিতে।
তবু ভেতরের দুর্বলতা রয়ে গেছে। নতুন সরকারের অধীনে দ্রুত নিরাপত্তা বাহিনী গঠনের প্রয়োজনে হাজার হাজার নতুন সদস্য নিয়োগ করা হয়েছে। সাবেক বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে। এত দ্রুত নিয়োগের ফলে যাচাই প্রক্রিয়ায় ফাঁক থেকে যাচ্ছে, আর সেই ফাঁকেই ঢুকে পড়ছে বিপদ।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা, পালমিরার হামলা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নাও হতে পারে। দুর্বল নজরদারি ও মতাদর্শিক উগ্রতার সুযোগে আরও হামলার ঝুঁকি রয়ে গেছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের আস্থা নড়বড়ে হতে পারে, সিরিয়ার নতুন সরকার সত্যিই নিরাপত্তা দিতে পারবে কি না, সেই প্রশ্ন আরও জোরালো হবে।
আইএসআইএলের লক্ষ্য এখন আর শহর দখল নয়। তারা জানে, সেই দিন শেষ। তাদের কৌশল বদলেছে। তারা চায় অস্থিতিশীলতা, ভয় আর অনিশ্চয়তা ছড়াতে। একক হামলায় সম্পর্ক নড়িয়ে দিতে, বিশ্বাসে ফাটল ধরাতে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, ধর্মীয় সংখ্যালঘু, নিরাপত্তা বাহিনী কিংবা বিদেশি নাগরিক, যে কেউ হতে পারে তাদের লক্ষ্য। এমনকি আইএসআইএলের বন্দিশিবিরগুলোও হামলার লক্ষ্য হতে পারে।
একটি ভঙ্গুর রাষ্ট্রে ছোট আগুনও বড় দাবানলে রূপ নিতে পারে। আইএসআইএল সেই আগুন জ্বালাতে জানে। আর তাই সিরিয়ার নতুন ভোরের আকাশে এখনো কালো ধোঁয়ার আশঙ্কা কাটেনি।
















