কিয়েভ, ইউক্রেন – ইউক্রেনের রাজধানীর সেন্ট সোফিয়া স্কয়ারে দাঁড়িয়ে, শীতের আলোয় ঝলমল করা বড়দিনের গাছের পাশে খোঁড়াতে খোঁড়াতে হাঁটছিলেন ভাসিলি। এক পা হারানো এই ইউক্রেনীয় কর্মকর্তা বললেন, রাশিয়ান সেনারা ইউক্রেনীয়দের ভয় পায়। “আমি তাদের ট্রেঞ্চে ঝাঁপ দিয়েছি, তারা সত্যিই আতঙ্কিত,” কণ্ঠে গর্ব আর ক্লান্তির মিশ্র সুর।
কিন্তু এই ভয়ই যুদ্ধের সমাপ্তি টেনে আনবে না। ভাসিলির কথায়, রাশিয়ার হাতে বেশি সেনা, শক্তিশালী অর্থনীতি আর বিশাল যুদ্ধভাণ্ডার রয়েছে। অন্যদিকে ইউক্রেন অস্ত্র ও জনবলের ঘাটতিতে ভুগছে। তিনি স্মরণ করলেন ফ্রন্টলাইনের দিনগুলোর কথা, যখন শত্রু ট্যাংকের অবস্থান জানালেও আঘাত হানার মতো গোলা ছিল না। ২০২৩ সালে ল্যান্ডমাইনে পা হারালেও তিনি এখনো সেনাবাহিনীতে রয়েছেন।
ইউক্রেনের সাবেক উপপ্রধান সেনাপ্রধান ইহোর রোমানেঙ্কো মনে করেন, যুদ্ধের সম্পূর্ণ অবসান নয়, বরং সাময়িক বিরতিই হতে পারে সবচেয়ে বাস্তবসম্মত ফল। তার মতে, রাশিয়ার মতো প্রতিবেশীর সঙ্গে পূর্ণ শান্তির আশা করা কঠিন। ইউক্রেন যদি ১৯৯১ সালের সীমানা অনুযায়ী নিজের ভূখণ্ড মুক্ত করতে না পারে, তবে সংঘাত থামবে না।
তিনি বলেন, সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি ভাঙলে ইউক্রেনকে আবারও সামরিক শক্তি বাড়িয়ে ফ্রন্টলাইনে রাশিয়াকে ঠেকাতে হবে। এজন্য সার্বজনীন ও ন্যায্য সামরিক সমাবেশ, দেশীয় অস্ত্র উৎপাদন বৃদ্ধি এবং কঠোর সামরিক আইন প্রয়োজন। বর্তমানে ইউক্রেনের সামরিক শিল্প নিজস্ব চাহিদার প্রায় ৪০ শতাংশ জোগান দিচ্ছে, বাকিটা আসছে পশ্চিমা মিত্রদের সহায়তা থেকে।
বিশ্লেষক ভলোদিমির ফেসেনকোর মতে, ২০২৬ সালের দ্বিতীয়ার্ধে শান্তিচুক্তির একটি সুযোগের জানালা খুলতে পারে, যদি রাশিয়া বুঝতে পারে যে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধেও ইউক্রেন টিকে থাকতে সক্ষম। তবে সবকিছুই নির্ভর করছে ক্রেমলিন ও প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের রাজনৈতিক ইচ্ছার ওপর। তিনি বলেন, চুক্তিতে পৌঁছালেও তা বাস্তবায়নে সময় লাগবে এবং ইউক্রেনকে কঠিন আপস করতে হতে পারে।
এই যুদ্ধের ভবিষ্যৎ শুধু ইউক্রেন বা রাশিয়ার হাতে নেই। বিশ্লেষক ইহার তিশকেভিচ বলেন, ২০২৬ সালে বিশ্বব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক ভূমিকায় পরিবর্তন, চীনের উত্থান এবং বহু-মেরুকেন্দ্রিক বিশ্বের দিকে অগ্রসর হওয়া আন্তর্জাতিক আইন ও শক্তির ভারসাম্যকে দুর্বল করতে পারে। এর প্রভাব সরাসরি পড়বে ইউক্রেনের অবস্থানের ওপর।
সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি হতে পারে তথাকথিত ফিনিশ দৃশ্যপট, যেখানে ইউক্রেন দখলকৃত অঞ্চলগুলোকে রাশিয়ার অংশ হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য হবে। আরেকটি সম্ভাবনা জর্জিয়ার মতো, যেখানে অঞ্চলগুলোর নিয়ন্ত্রণ হারালেও ইউক্রেন সেগুলোকে রাশিয়ার বলে স্বীকৃতি দেবে না। তৃতীয় পথটি হলো জমাটবদ্ধ যুদ্ধ, যেখানে সংঘর্ষ থেমে থাকবে, কিন্তু আলোচনা চলবে।
গবেষক নিকোলাই মিত্রোখিনের মতে, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা দুর্বল হওয়ায় রাশিয়া অন্তত আরও দুই বছর যুদ্ধ চালানোর সামর্থ্য রাখে। অন্যদিকে ইউক্রেন প্রতিরোধ চালাতে পারলেও রাজনৈতিক দুর্বলতা ও দুর্নীতি বড় বাধা। ফলে ধীরে ধীরে কিছু গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় পিছু হটছে ইউক্রেনীয় বাহিনী।
এদিকে সাধারণ ইউক্রেনীয়দের মধ্যে যুদ্ধক্লান্তি বাড়ছে। বোমা, ব্ল্যাকআউট আর অর্থনৈতিক মন্দায় জর্জরিত মানুষ শান্তির জন্য আকুল। ৬৩ বছর বয়সী অর্থনীতিবিদ তারাস তিমোশচুক বলেন, “আমি চাই পাখির ডাক শুনে ঘুম ভাঙুক, ড্রোন আর ক্ষেপণাস্ত্রের শব্দে নয়।”
এই আকাঙ্ক্ষার মাঝেই দাঁড়িয়ে আছে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। ২০২৬ কি আনবে যুদ্ধের অবসান, নাকি আরও দীর্ঘ রক্তক্ষয়? উত্তর এখনো সময়ের গর্ভে।
















