নতুন বন্দোবস্তের রাজনীতি কি জোটের অঙ্কে হারিয়ে ফেলছে এনসিপির স্বতন্ত্র পরিচয়
তারুণ্যনির্ভর নতুন রাজনীতির স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা শুরু করা জাতীয় নাগরিক পার্টি এখন জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে আসন সমঝোতার আলোচনায়—এই বাস্তবতা কি এনসিপির স্বাধীন রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে?
নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণ ও পুরোনো ধারার রাজনীতির বাইরে গিয়ে ‘নতুন বন্দোবস্ত’-এর স্বপ্ন দেখিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলটির নেতৃত্বে ছিলেন জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধিরা। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে জামায়াতে ইসলামী–র সঙ্গে আসন ভাগাভাগির আলোচনা সেই স্বপ্নের পথচলাকে নতুন করে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছিলেন, দলটি এককভাবেই নির্বাচনে যাবে। সেই লক্ষ্যেই প্রথম ধাপে ১২৫টি আসনে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়। পরে বাকি আসনগুলোতেও প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতি ছিল। এরই মধ্যে এনসিপি, আমার বাংলাদেশ পার্টি ও বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন মিলিয়ে ‘গণতান্ত্রিক সংস্কার জোট’ গঠিত হয়। কিন্তু হঠাৎ করেই জামায়াতের সঙ্গে সম্ভাব্য নির্বাচনি সমঝোতার খবর রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যদি জামায়াতের সঙ্গে ২৫ থেকে ৫০টি আসনে সমঝোতা হয়, তাহলে এনসিপির ইতোমধ্যে ঘোষিত বহু প্রার্থী বাদ পড়বেন। এতে দলটির ভেতরে ভাঙন তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এরই মধ্যে জামায়াতবিরোধী অবস্থানের জন্য পরিচিত এনসিপি নেতা মীর আরশাদুল হকের পদত্যাগ সেই সংকটের ইঙ্গিত দেয়।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইসলামপন্থি দলগুলোর প্রভাব নিয়ে আলোচনা নতুন নয়। অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে জামায়াতসহ বিভিন্ন ইসলামপন্থি শক্তি দৃশ্যমানভাবে সক্রিয় হয়েছে। তবে বাস্তবতা হলো—বাংলাদেশের ভোটাররা ঐতিহাসিকভাবে মধ্যপন্থী রাজনীতিকেই বেশি গ্রহণ করেছেন। বিএনপি, আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির বাইরে অন্য কোনো দল এককভাবে সরকার গঠন করতে পারেনি। জামায়াত অতীতে জোটের অংশ হলেও কখনোই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি।
নতুন আরপিও অনুযায়ী, জোট হলেও প্রত্যেক দলকে নিজস্ব প্রতীকে নির্বাচন করতে হবে। এতে জামায়াত ছাড়া অন্যান্য ইসলামপন্থি দলগুলোর পক্ষে বিজয় অর্জন কঠিন হয়ে পড়ে। এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে—জামায়াতের সঙ্গে জোট করে এনসিপি আদৌ কতটি আসন পাবে, নাকি তারা কেবল নিজেদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিচয় ঝুঁকির মুখে ফেলবে?
শুরু থেকেই এনসিপিকে ‘জামায়াতের বি-টিম’ হিসেবে চিহ্নিত করার একটি প্রচারণা ছিল। জামায়াতের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সমঝোতা হলে সেই ধারণা আরও শক্তিশালী হবে বলে আশঙ্কা করছেন দলটির ভেতরেরই একাংশ। অথচ অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের দল হিসেবে এনসিপির প্রতি মানুষের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা যদি তারা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, মধ্যপন্থী ও দুর্নীতিমুক্ত রাজনৈতিক সংস্কৃতি উপহার দিতে পারত, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে তারা একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারত।
রাজনীতির বাস্তবতা হলো—ক্ষমতায় যাওয়া একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। দ্রুত ক্ষমতায় যাওয়ার তাড়নায় পুরোনো ধারার দলগুলোর সঙ্গে একই পথে হাঁটলে ‘নতুন বন্দোবস্ত’-এর স্বপ্ন ভেঙে পড়তে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, এনসিপির উচিত এককভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ধীরে ধীরে আস্থা অর্জন করা। এবারের নির্বাচনে আসন না পেলেও ভবিষ্যতের জন্য স্বতন্ত্র রাজনৈতিক ভিত্তি গড়ে তোলাই হতে পারে তাদের জন্য টেকসই পথ।
















