ইসরায়েল ও লেবাননের সীমান্তজুড়ে সামরিক স্থাপনা, কৃষিজমি ও বসতিগুলোর মাঝেই ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ বনভূমি। দক্ষিণ লেবাননের আইতা আশ-শাব গ্রামের প্রান্তে অবস্থিত হারজ আল-রাহেব বা মঙ্ক ফরেস্ট ছিল ওই অঞ্চলের শেষ দিকের প্রাকৃতিক আশ্রয়গুলোর একটি। প্রায় ১৬ হেক্টর জুড়ে বিস্তৃত এই বন একসময় পরিবেশগত বৈচিত্র্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের জন্য স্থানীয়ভাবে সংরক্ষিত ছিল।
২০২৩ সালের অক্টোবরের শুরুতেও এই বনভূমি ছিল ওক, ক্যারব, তেরেবিন্থ ও তেজপাতা গাছে ঘেরা। স্থানীয়রা তেরেবিন্থের বীজ দিয়ে রুটি বানাতেন, আর তেজপাতা থেকে তেল বের করে তৈরি হতো ঐতিহ্যবাহী সাবান। ঝোপঝাড় ও বুনো ফুলে ভরা এলাকাটি মৌমাছি চাষের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ ছিল, যা লেবাননের অর্থনৈতিক সংকটের পর অনেক পরিবারের বাড়তি আয়ের উৎস হয়ে ওঠে।
কিন্তু ইসরায়েল-লেবানন সংঘাত সেই পরিবেশ টিকিয়ে রাখতে পারেনি। এক বছরের বেশি সময় ধরে চলা বিমান হামলা ও গোলাবর্ষণের পর ২০২৪ সালের নভেম্বরে যুদ্ধবিরতি হলেও সীমান্ত এলাকায় হামলা থামেনি। মানবিক ক্ষতির পাশাপাশি, এই যুদ্ধ প্রকৃতির ওপর রেখে গেছে গভীর ক্ষত। চার হাজারের বেশি লেবানিজ নিহত হওয়ার পাশাপাশি, হারজ আল-রাহেবসহ আশপাশের এলাকা আজ প্রায় প্রাণহীন।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলি হামলায় বাগান পুড়ে গেছে, বিস্তীর্ণ এলাকায় গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। বুনো ফুলের সঙ্গে সঙ্গে কমে গেছে পরাগায়নকারী পাখি ও কীটপতঙ্গ। মৌমাছি চাষে নির্ভরশীল অনেক পরিবার তাদের চাক হারিয়ে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছে।
বর্তমানে বনভূমির বড় অংশে সাদা ফসফরাসের গোলার চিহ্ন ও বুলডোজারের ক্ষত দেখা যাচ্ছে। স্যাটেলাইট ছবিতে একসময়কার সবুজ পাহাড় এখন গর্ত ও উজাড় জমিতে পরিণত হয়েছে। আইতা আশ-শাব গ্রাম, যার ইতিহাস শতাব্দীপ্রাচীন, যুদ্ধের ধাক্কায় সেই ধারাবাহিকতা হারিয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, যুদ্ধের পর ইসরায়েলি বাহিনী বুলডোজার দিয়ে সীমান্ত পেরিয়ে গাছপালা সম্পূর্ণ পরিষ্কার করেছে। অনেকের ধারণা, সীমান্তে একটি জনশূন্য বাফার জোন তৈরির লক্ষ্যেই এই পদক্ষেপ। আগুন ও বোমায় যা অবশিষ্ট ছিল, সেটুকুও মুছে ফেলা হয়েছে বলে অভিযোগ গ্রামবাসীদের।
এই বন শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অংশ ছিল না, বরং মাটি ধরে রাখা, পানির উৎস রক্ষা ও বন্যপ্রাণীর আবাস হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। শিয়াল, শিয়ালজাতীয় প্রাণী, হায়েনা, ব্যাজারসহ নানা স্তন্যপায়ী ও পাখির আবাস ছিল এখানে। যুদ্ধের পর অনেক প্রাণী ধ্বংসপ্রাপ্ত গ্রামে আশ্রয় নিচ্ছে, কিছু পরিবার তাদের খাবার দিচ্ছে, আকাশে তখনো ড্রোন উড়ছে।
পরিবেশবিদদের মতে, দক্ষিণ লেবাননের পাহাড়ি এলাকা ছিল ভূমধ্যসাগরীয় পাখি অভিবাসন পথের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যুদ্ধের ফলে এই পথও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সাদা ফসফরাস ও ভারী ধাতুর অবশিষ্টাংশ মাটি ও পানিকে দূষিত করছে, যা কৃষি ও জনস্বাস্থ্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করছে।
আন্তর্জাতিক সংরক্ষণ সংস্থাগুলোর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। যদিও লেবাননে যুদ্ধজনিত পরিবেশ ধ্বংস স্বীকার করে কিছু সাধারণ প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে, তবে নির্দিষ্টভাবে দায়ী পক্ষ বা অস্ত্র ব্যবহারের প্রসঙ্গ তাতে নেই। পরিবেশ ধ্বংসকে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের বিষয়টি এখনো স্পষ্ট আন্তর্জাতিক জবাব পাচ্ছে না।
স্থানীয় পরিবেশ সংগঠনগুলোর দাবি, পুনরুদ্ধারের আগে জরুরি ভিত্তিতে মাটি ও পরিবেশগত পরীক্ষা প্রয়োজন। তবে নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে এখনো সেই কাজ শুরু করা যাচ্ছে না। যুদ্ধবিরতির পরও হামলা চলায় এই এলাকা পুনর্গঠনের জন্য নিরাপদ নয় বলে জানানো হয়েছে।
















