উৎসবের দিনে, বিশেষ করে বড়দিন বা অন্য পারিবারিক আয়োজনের সময়, অনেকেই স্বাভাবিক সীমা ছাপিয়ে খেয়ে ফেলেন। প্রশ্ন হলো, এমন বড় ভোজ শরীর ও মস্তিষ্কে আসলে কী প্রভাব ফেলে।
খাবার আমাদের মস্তিষ্কের নানা গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি জোগায়। স্মৃতি, মনোযোগ ও মানসিক স্বাস্থ্যের সঙ্গে সুষম খাদ্যের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। তবে একবারে অনেক বেশি খাওয়া হলে তাৎক্ষণিকভাবে মস্তিষ্কে কী ঘটে, সে বিষয়ে কৌতূহল রয়েছে অনেকের।
খাওয়ার সময় শরীরের বিভিন্ন অংশ থেকে সংকেত মস্তিষ্কে পৌঁছে জানায় যে আমরা তৃপ্ত। অন্ত্র থেকে নিঃসৃত হরমোন ও খাবার ভাঙার সময় তৈরি হওয়া বিভিন্ন উপাদান এই প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে অগ্ন্যাশয় থেকে ইনসুলিন নিঃসরণ হয়ে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে আসে। এই পুরো প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘স্যাটাইটি ক্যাসকেড’।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় খাবারের পর যে ঘুমঘুম ভাব আসে, যাকে অনেক সময় ‘ফুড কোমা’ বলা হয়, সেটির সঙ্গে এই হরমোনগত পরিবর্তনের সম্পর্ক থাকতে পারে। আগে ধারণা ছিল, খাওয়ার পর মস্তিষ্ক থেকে রক্ত পাকস্থলীর দিকে বেশি চলে যাওয়ায় এমনটা হয়। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, বড় খাবারের পর মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ কমে না। এই ঘুমঘুম ভাবের সুনির্দিষ্ট কারণ এখনও পুরোপুরি পরিষ্কার নয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, মাঝেমধ্যে অতিরিক্ত খাওয়া সাধারণত বিপাকক্রিয়ার ওপর বড় কোনো ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে না। ২০২০ সালে করা এক গবেষণায় সুস্থ তরুণদের একবার স্বাভাবিক পরিমাণে এবং আরেকবার পেট ভরে যাওয়ার পরও খেতে দেওয়া হয়। দেখা যায়, দ্বিগুণ ক্যালরি গ্রহণের পরও তাদের রক্তে শর্করা বা চর্বির মাত্রা স্বাভাবিক খাবারের চেয়ে বেশি বাড়েনি। শরীর বাড়তি ইনসুলিন ও হরমোন নিঃসরণ করে পরিস্থিতি সামলে নেয়।
তবে গবেষকরা সতর্ক করেছেন, এই ফলাফল সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নাও হতে পারে। কারণ এই গবেষণায় কেবল তরুণ, সুস্থ পুরুষদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।
অন্যদিকে, দীর্ঘ সময় ধরে বা একাধিক দিন ধরে অতিরিক্ত খাওয়া হলে চিত্র ভিন্ন হতে পারে। ২০২১ সালের একটি গবেষণায় কয়েক ঘণ্টা ধরে উচ্চ চর্বি ও চিনি সমৃদ্ধ খাবার এবং অ্যালকোহল গ্রহণের পর দেখা যায়, অংশগ্রহণকারীদের যকৃতে চর্বি জমতে শুরু করেছে। দীর্ঘমেয়াদে এমন খাদ্যাভ্যাস নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার রোগের ঝুঁকি বাড়ায়, যা মস্তিষ্কে অক্সিজেন সরবরাহ কমাতে পারে এবং প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে।
বিজ্ঞানীরা মনে করেন, বিবর্তনের দৃষ্টিকোণ থেকে মানুষ মাঝে মাঝে বেশি খাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নিতে শিখেছে। খাদ্যের অভাব ছিল মানব ইতিহাসের বড় চ্যালেঞ্জ, তাই শরীর ও মস্তিষ্ক এমনভাবে গড়ে উঠেছে যাতে একবার বেশি খেলে তাত্ক্ষণিক ক্ষতি না হয়। তবে দীর্ঘদিন অতিরিক্ত ও অস্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণের প্রভাব ধীরে ধীরে জমা হয়।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, কয়েক দিন ধরে অতিরিক্ত চিনি ও চর্বিযুক্ত খাবার খেলে মস্তিষ্কের ইনসুলিন প্রতিক্রিয়া বদলে যেতে পারে। এতে ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণ ও স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত অংশগুলো কম সক্রিয় হয়। এমনকি স্বাভাবিক খাদ্যে ফিরে যাওয়ার পরও কিছু ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের এই পরিবর্তন পুরোপুরি সেরে উঠতে সময় লাগে।
সব মিলিয়ে বিশেষজ্ঞদের মত হলো, একদিনের উৎসবের ভোজ সাধারণত মস্তিষ্কের জন্য ক্ষতিকর নয়। তাই মাঝেমধ্যে আনন্দ করে খাওয়াটা বড় সমস্যা নয়। তবে এই অভ্যাস যদি টানা কয়েক দিন বা দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকে, তাহলে তা শরীর ও মস্তিষ্কের ওপর চাপ ফেলতে পারে। তাই উৎসব উপভোগ করা ভালো, কিন্তু নিয়মিত খাদ্যাভ্যাসে ভারসাম্য রাখা জরুরি।
















