নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনৈতিক অস্থিরতায় ঝুঁকিতে সামষ্টিক অর্থনীতি
নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়তে থাকায় দেশের বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা সামষ্টিক অর্থনীতিকে আবারও ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে বলে সতর্ক করছেন অর্থনীতিবিদরা।
বছর শেষের দিকে রাজনৈতিক অস্থিরতা বেড়ে যাওয়ায় দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি নতুন করে ঝুঁকির মুখে পড়ছে। রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি তৈরি হওয়ায় সরকারের আয় কমছে, বিপরীতে ব্যয়ের চাপ বাড়ছে। সংকুচিত বাজেটের কারণে উন্নয়ন ব্যয়ে বড় ধরনের কাটছাঁট করা হলেও অনুন্নয়ন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা যাচ্ছে না।
প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, গত বছর জুলাই মাসে আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পর দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। সেই পরিস্থিতি সামাল দিতে অন্তর্বর্তী সরকার টানা ১৫ মাস ধরে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এই সময়ে অর্থনীতিতে কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরলেও অনিশ্চয়তা পুরোপুরি কাটেনি। এর মধ্যেই জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নতুন করে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ায় অর্থনৈতিক ঝুঁকি আবার সামনে চলে এসেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হলে ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে, বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়বে এবং সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকায় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এ প্রেক্ষাপটে নির্বাচনের আগে যে কোনো মূল্যে আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যেন কোনো ধরনের ছেদ না ঘটে, সে বিষয়েও কড়া নজরদারির নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় স্থিতিশীলতা ফিরেছে এবং অর্থনীতি ভেঙে পড়ার মতো অবস্থায় নেই। তবে ঝুঁকি পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব নয়। তার মতে, সঠিক সময়ে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন না হলে এই স্থিতিশীলতা ধরে রাখা কঠিন হবে। সরকার বছরের শেষে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৪ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়েছে বলেও তিনি জানান।
সাবেক উপদেষ্টা ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, গত ১৫ মাস ধরে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে কার্যত অচলাবস্থা চলছে। উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীরা বর্তমানে অপেক্ষা ও পর্যবেক্ষণের অবস্থানে রয়েছেন। সুষ্ঠু ও সময়মতো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে নতুন সরকার গঠনের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরবে এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে। নতুন শিল্পকারখানা স্থাপনের মধ্য দিয়ে অর্থনীতিতে গতি আসবে বলেও তিনি আশাবাদ প্রকাশ করেন। তবে রাজনৈতিক অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে অর্থনীতি আবার থমকে দাঁড়াবে বলে সতর্ক করেন তিনি।
বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনও মনে করেন, নির্বাচনের সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিই অর্থনীতির গতিপথ নির্ধারণ করবে। পরিস্থিতির অবনতি হলে অর্থনৈতিক ঝুঁকি অনিবার্যভাবে বাড়বে।
এদিকে বিশ্লেষক ও ব্যবসায়ী মহলের একাংশ আশঙ্কা প্রকাশ করছেন, ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদির ওপর হামলার ঘটনা নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তকে ব্যাহত করতে পারে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সহিংসতা বাড়লে নির্বাচন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতাও হুমকির মুখে পড়তে পারে।
সব মিলিয়ে অর্থনীতিবিদদের মতে, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে স্থবিরতা কাটাতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সময়মতো একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনই এখন সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি।
















