জ্বালানি দক্ষতা বাড়াতে প্রায় এক দশক ধরে নেওয়া উদ্যোগের সুফল পেতে শুরু করেছে বাংলাদেশ। একটি নতুন গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই উদ্যোগের ফলে এক অর্থবছরেই বিপুল অঙ্কের জ্বালানি আমদানি ব্যয় সাশ্রয় সম্ভব হয়েছে।
ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস বা আইইইএফএর ১৭ ডিসেম্বর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গত এক দশকের কম সময়ে বাংলাদেশে জ্বালানি দক্ষতা বেড়েছে ১৩ দশমিক ৬৪ শতাংশ। গড়ে বছরে এই উন্নতির হার ১ দশমিক ৫২ শতাংশ। শুধু ২০২৩-২৪ অর্থবছরেই প্রায় ৭ মিলিয়ন টন তেলসমমান জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার এড়ানো গেছে, যার ফলে প্রায় ৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার আমদানি ব্যয় সাশ্রয় হয়েছে।
‘বাংলাদেশের জ্বালানি দক্ষতার লক্ষ্য অর্জনের পথে’ শীর্ষক প্রতিবেদনে আইইইএফএর বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শাফিকুল আলম বলেন, ২০১৪-১৫ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের মধ্যে দেশের জ্বালানি দক্ষতা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। যদিও ২০১৬-১৭ অর্থবছরের পর কিছু সময় অগ্রগতি মন্থর ছিল, তবে ২০২০-২১ সালের পর জ্বালানি সরবরাহ সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির কারণে দক্ষতা বৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৬ সালে প্রণীত এনার্জি এফিসিয়েন্সি অ্যান্ড কনজারভেশন মাস্টার প্ল্যান এ ক্ষেত্রে একটি কার্যকর ভিত্তি তৈরি করে। পরবর্তীতে বিভিন্ন নীতিমালা, স্বল্পসুদে অর্থায়ন ও সহায়ক কর্মসূচির মাধ্যমে বাংলাদেশ নির্ধারিত লক্ষ্যের চেয়ে আগেই জ্বালানি দক্ষতা অর্জনের পথে রয়েছে।
আইইইএফএর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ ২০৩০ সালের জন্য নির্ধারিত জ্বালানি দক্ষতার লক্ষ্য এক বছর আগেই অর্জন করতে পারবে। এমনকি ২০২২ সালের ভিত্তিতে ২০৩৫ সালের জন্য নির্ধারিত ১৯ দশমিক ২ শতাংশ দক্ষতার লক্ষ্যও সময়ের আগেই পূরণ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, দেশের মোট জ্বালানি ব্যবহারের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ হয় গৃহস্থালি ও শিল্প খাতে। তাই এই দুই খাতে আরও কার্যকর উদ্যোগ নিলে সাশ্রয়ের পরিমাণ বাড়ানো সম্ভব। গৃহস্থালি ও বাণিজ্যিক খাতে এলইডি বাতি ব্যবহার বৃদ্ধি, শক্তি-সাশ্রয়ী শীতাতপ নিয়ন্ত্রক যন্ত্রের জনপ্রিয়তা এবং শিল্প খাতে দক্ষ মোটর ও বৈদ্যুতিক বয়লার ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ভবন খাতে জ্বালানি দক্ষতা নিশ্চিত করতে মানসম্মত লেবেলিং ব্যবস্থা ও ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড ২০২০ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন জরুরি। একই সঙ্গে এলইডি বাতি ও উন্নত প্রযুক্তির যন্ত্রাংশ আমদানিতে উচ্চ শুল্ক কমানোর আহ্বান জানানো হয়েছে, যাতে সাধারণ ভোক্তাদের জন্য এসব পণ্য আরও সহজলভ্য হয়।
আইইইএফএর প্রতিবেদনে জ্বালানি দক্ষতা বাড়াতে জনসচেতনতা কর্মসূচি জোরদার, বড় জ্বালানি ব্যবহারকারীদের জন্য সাশ্রয় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ, স্বল্পসুদে অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারণ এবং একটি বিশেষায়িত এনার্জি সার্ভিস কোম্পানি গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে।
শাফিকুল আলম বলেন, জ্বালানি দক্ষতা শুধু খরচ কমানোর বিষয় নয়, এটি দ্রুত দেশের জ্বালানি ব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। এজন্য নীতিনির্ধারক, ভোক্তা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও প্রযুক্তি সরবরাহকারীদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
















