ঢাকা | ৬ অক্টোবর ২০২৫ | বিশ্লেষণ প্রতিবেদন
বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি বলে বিবেচিত তৈরি পোশাক শিল্প সেপ্টেম্বরে রফতানিতে বড় ধরণের ধাক্কা খেয়েছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তৈরি পোশাক রফতানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫.৬৬ শতাংশ কমেছে।
বাণিজ্য বিশ্লেষকরা বলছেন, এই পতন কেবল একটি মাসের অস্থায়ী ঘটনা নয়; বরং এটি বাংলাদেশের রফতানি নির্ভর অর্থনীতির জন্য গভীর কাঠামোগত চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত বহন করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শুল্ক-সংকট
রফতানি হ্রাসের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক নীতি। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন বাংলাদেশি পোশাকের ওপর শুল্কহার পুনর্মূল্যায়ন করেছে, ফলে ক্রেতা ও সরবরাহকারীদের ওপর অতিরিক্ত খরচের বোঝা পড়ছে।
রফতানিকারকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান খুচরা বিক্রেতারা এখন চীনা ও ভিয়েতনামি সরবরাহকারীদের দিকে ঝুঁকছেন, কারণ তারা বৃহৎ পরিসরে কম দামে পণ্য সরবরাহ করতে পারছে। এর ফলে বাংলাদেশের অর্ডার কমে আসছে, বিশেষ করে মাঝারি ও ছোট কারখানাগুলোর ক্ষেত্রে।
বাংলাদেশের পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) জানিয়েছে, “শুল্কবৃদ্ধি ও সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যয় বাড়ায় প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে।”
ইউরোপে প্রতিযোগিতা, দক্ষিণ এশিয়ায় চাপ
ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারেও প্রতিযোগিতা তীব্র হচ্ছে। ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও কম্বোডিয়া ইতোমধ্যে ইউরোপে রফতানিতে আগ্রাসী অবস্থান নিয়েছে। ফলে বাংলাদেশি রফতানিকারকরা একইসঙ্গে দুই দিকের চাপের মুখে পড়েছে—
একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শুল্ক-অস্থিরতা, অন্যদিকে ইউরোপে দামের প্রতিযোগিতা।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপের মন্দা ও চাহিদা হ্রাসও বাংলাদেশি পোশাকের অর্ডার কমিয়ে দিচ্ছে। বিশেষ করে ফাস্ট-ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলো এখন ক্রমেই কম দামের দেশগুলোর দিকে মনোযোগ দিচ্ছে।
দেশীয় খরচ বৃদ্ধি ও টিকে থাকার লড়াই
দেশে উৎপাদন খরচ বাড়া—বিশেষ করে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও শ্রম ব্যয় বৃদ্ধিও রফতানিকারকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান বলছে, তারা এখন উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে রফতানি দামের সামঞ্জস্য রাখতে পারছে না।
একজন রফতানিকারক ইনকিলাবকে বলেন, “আমরা এখন মূলত টিকে থাকার লড়াই করছি। বিদ্যুৎ বিল, কাঁচামালের দাম, আর আন্তর্জাতিক শুল্ক—সব মিলিয়ে লাভ তো দূরের কথা, অর্ডার ধরে রাখাই কঠিন হয়ে যাচ্ছে।”
রফতানির ভবিষ্যৎ: আশার আলো ও শঙ্কা
বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) আশা করছে, আগামী মাসগুলোতে পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হতে পারে যদি আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা পুনরুদ্ধার হয়। তবে অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করছেন, সিপিইসি বা আঞ্চলিক বাণিজ্য সুযোগের মতো নতুন বাজারে প্রবেশ না করতে পারলে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি স্থবির হয়ে পড়ার আশঙ্কা আছে।
তারা বলছেন, “বাংলাদেশকে এখন শুধু সস্তা শ্রমের দেশ হিসেবে নয়, টেকসই ও পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের উদাহরণ হিসেবে নিজেকে তুলে ধরতে হবে। নইলে ভবিষ্যতে অর্ডার হারানোর ঝুঁকি বাড়বে।”
বিশ্লেষণ: প্রতিযোগিতার নতুন বাস্তবতা
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত যে সাফল্যের গল্প একসময় বিশ্বকে দেখিয়েছিল, সেটি এখন নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। শ্রম ব্যয় বাড়ছে, ক্রেতারা বেশি সচেতন হচ্ছে, আর প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদনই ভবিষ্যতের পথ।
অর্থনীতিবিদ ফাহিমা নাসরিন বলেন,
“যদি বাংলাদেশ দ্রুত উৎপাদনশীলতা, দক্ষতা ও প্রযুক্তি ব্যবহারে বিনিয়োগ না বাড়ায়, তাহলে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়া অবশ্যম্ভাবী।”

সেপ্টেম্বরের ৫.৬৬ শতাংশ রফতানি পতন হয়তো সংখ্যায় ছোট মনে হতে পারে, কিন্তু এটি দেশের সবচেয়ে বড় রফতানি খাতের জন্য একটি সতর্ক সংকেত।
বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা যেমন কঠিন হচ্ছে, তেমনি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ব্যয়ও বেড়ে চলেছে। এই দুই চাপ সামলাতে না পারলে তৈরি পোশাক শিল্প—যা একসময় বাংলাদেশকে বৈদেশিক মুদ্রার যোগানদাতা হিসেবে স্থিতিশীল করেছিল—একটি অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে পড়তে পারে।
















