উত্তর-পূর্ব স্পেনের আরাগোন অঞ্চলের ছোট শহর ফিগুয়েরুয়েলাসের প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা একটি বিশাল উইন্ড টারবাইন স্পেনের নবায়নযোগ্য জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুৎ ব্যবস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছে। বাতাস ও রোদপ্রধান এই এলাকায় দেশটির বহু বায়ু ও সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প গড়ে উঠেছে। সম্প্রতি এখানেই বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি উৎপাদনের একটি বড় কারখানা নির্মাণ শুরু হওয়ায় স্পেনের সবুজ জ্বালানি রূপান্তরের গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়েছে।
চীনের ক্যাটল ও নেদারল্যান্ডসভিত্তিক স্টেলান্টিস যৌথভাবে প্রায় ৪ বিলিয়ন ইউরো বিনিয়োগ করছে এই প্রকল্পে। স্পেনে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত এটিকে ইউরোপে চীনের অন্যতম বৃহৎ বিনিয়োগ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ফিগুয়েরুয়েলাসের মেয়র লুইস বেরতোল মোরেনো জানান, সারা বছর বাতাস ও প্রচুর সূর্যালোক থাকায় এবং চারপাশে উইন্ড টারবাইন ও সৌর প্যানেল থাকায় এই অঞ্চলটি প্রকল্পটির জন্য উপযুক্ত ছিল।
স্পেনের বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ গত কয়েক বছরে দ্রুত বেড়েছে। ২০১৭ সালে যেখানে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে মোট বিদ্যুতের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসত, সেখানে গত বছর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৭ শতাংশে। সরকারের লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে এ হার ৮১ শতাংশে নেওয়া। প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ তাঁর সরকারের নীতিকে ‘গ্রিন, বেবি, গ্রিন’ বলে ব্যাখ্যা করে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সুফলের কথা তুলে ধরেছেন।
তবে সম্প্রতি এই নীতির কার্যকারিতা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। গত ২৮ এপ্রিল স্পেন ও প্রতিবেশী পর্তুগালের বড় অংশে কয়েক ঘণ্টার জন্য বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দেয়। সরকার পুরোপুরি ব্যাখ্যা দিতে না পারায় দেশটির জ্বালানি মিশ্রণ নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক তীব্র হয়। বিরোধী কনজারভেটিভ নেতা আলবের্তো নুনিয়েস ফেইহো অভিযোগ করেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এই ঘটনার পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।
যদিও সরকার ও জাতীয় গ্রিড পরিচালনাকারী রেড ইলেক্ত্রিকা এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের মতে, এর আগেও আরও বেশি নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ নিয়ে ব্যবস্থা চালু ছিল এবং তখন কোনো নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হয়নি। সংস্থাটির কর্মকর্তারা জানান, বিদ্যুৎ বিভ্রাটটি একাধিক কারিগরি সমস্যার সমন্বয়ে ঘটেছে এবং সাইবার হামলার সম্ভাবনাও নাকচ করা হয়েছে।
তবে এপ্রিলের ঘটনার পর থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহার কিছুটা বাড়ানো হয়েছে, যা স্পেনের জ্বালানি নীতির মোড় ঘোরানোর ইঙ্গিত দিচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে পারমাণবিক জ্বালানি খাতও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। বর্তমানে দেশটির বিদ্যুতের প্রায় ২০ শতাংশ আসে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে। সরকার ২০২৭ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে পাঁচটি পারমাণবিক কেন্দ্র বন্ধ করার পরিকল্পনা করলেও শিল্প খাত এর বিরোধিতা করছে এবং কিছু কেন্দ্রের মেয়াদ বাড়ানোর দাবি তুলেছে।
পারমাণবিক খাতের প্রতিনিধিরা বলছেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির সঙ্গে পারমাণবিক শক্তির সমন্বয় বিদ্যুৎ সরবরাহে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারে, কারণ আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল নবায়নযোগ্য উৎস সব সময় কার্যকর থাকে না।
এদিকে স্পেনের রাজনৈতিক পরিস্থিতিও জ্বালানি নীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। বর্তমান সরকার দুর্নীতির অভিযোগ ও সংসদীয় সংকটে রয়েছে, ফলে আগাম নির্বাচনের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। জরিপ অনুযায়ী ডানপন্থী সরকার এলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রতি সমর্থন কমে যেতে পারে এবং প্রচলিত জ্বালানির দিকে ঝোঁক বাড়তে পারে।
তবে আপাতত স্পেনের নবায়নযোগ্য জ্বালানি রূপান্তর চলমান রয়েছে। ফিগুয়েরুয়েলাসে এর প্রভাব স্পষ্ট—এক হাজার মানুষের এই শহরে নতুন কারখানা নির্মাণে প্রায় দুই হাজার চীনা কর্মী আসার কথা রয়েছে এবং প্রকল্পটি চালু হলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দারা মনে করছেন, এই বিনিয়োগ শুধু পরিষ্কার জ্বালানিই নয়, পুরো এলাকার অর্থনীতিকেও নতুন গতি দেবে।
















