মিয়ানমারের সামরিক সরকার দাবি করেছে, কারাবন্দী নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী ও দেশটির গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী অং সান সু চি ভালো আছেন। তবে তাঁর ছেলে কিম অ্যারিস এই দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ না থাকায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
মঙ্গলবার রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত মিয়ানমার ডিজিটাল নিউজে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘দও অং সান সু চি সুস্বাস্থ্যে আছেন।’ তবে বিবৃতিতে তাঁর শারীরিক অবস্থার বিস্তারিত কোনো তথ্য বা প্রমাণ দেওয়া হয়নি।
এই ঘোষণার একদিন আগে রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কিম অ্যারিস জানান, ৮০ বছর বয়সী তাঁর মায়ের শারীরিক অবস্থার বিষয়ে তিনি প্রায় কোনো তথ্যই পাচ্ছেন না। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, মায়ের মৃত্যুর খবরও হয়তো তাঁকে না জানিয়ে রাখা হতে পারে।
সামরিক সরকারের বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় কিম অ্যারিস বলেন, সরকার দাবি করছে তাঁর মা ভালো আছেন, কিন্তু এর পক্ষে কোনো স্বাধীন প্রমাণ দিচ্ছে না। কোনো সাম্প্রতিক ছবি, চিকিৎসা প্রতিবেদন কিংবা পরিবার, চিকিৎসক বা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ দেওয়া হয়নি। তাঁর ভাষায়, ‘তিনি যদি সত্যিই সুস্থ থাকেন, তাহলে তারা সেটা প্রমাণ করুক।’
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাওয়া হলে মিয়ানমারের সামরিক সরকারের একজন মুখপাত্র সাড়া দেননি।
গত অক্টোবরে এশিয়া টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কিম অ্যারিস জানান, তাঁর ধারণা, রাজধানী নেইপিদোতে একটি কারাগারে একাকী বন্দিত্বে রাখা হয়েছে অং সান সু চিকে। অন্তত দুই বছর ধরে তাঁকে কেউ দেখেনি, এমনকি অন্য বন্দীরাও নন।
২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকার উৎখাতের পর অং সান সু চিকে আটক করা হয়। পরে উসকানি, দুর্নীতি ও নির্বাচন জালিয়াতিসহ একাধিক মামলায় তাঁকে ২৭ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এসব অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা, যা সু চি নিজেও অস্বীকার করেছেন।
কিম অ্যারিস আরও বলেন, সামরিক বাহিনী নিয়মিত তাঁর মায়ের স্বাস্থ্যের বিষয়ে গুজব ছড়ায়। কখনো বলা হয় তাঁকে গৃহবন্দী রাখা হয়েছে, আবার কখনো বলা হয়েছে তিনি স্ট্রোক করেছেন বা মারা গেছেন। তিনি বলেন, এই ভুয়া তথ্যের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া অত্যন্ত কষ্টকর।
২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর থেকে মিয়ানমারে গৃহযুদ্ধ চলমান। এর মধ্যেই সামরিক সরকার চলতি মাসের শেষে নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা করছে, যাকে বিশ্লেষক ও বেশ কয়েকটি বিদেশি সরকার ভুয়া নির্বাচন বলে আখ্যা দিয়েছে। তাঁদের মতে, এটি সামরিক শাসনকে বৈধতা দেওয়ার কৌশল।
এই পরিস্থিতিতে অং সান সু চির দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি এখনো নিষিদ্ধ রয়েছে এবং অনেক বিরোধী রাজনৈতিক দল নির্বাচন বর্জন করেছে।
বুধবার সামরিক সরকার জানায়, নির্বাচন ‘ব্যাহত করার’ অভিযোগে ২০০ জনের বেশি ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা প্রক্রিয়া চলছে। স্বরাষ্ট্রবিষয়ক মন্ত্রী টুন টুন নাউং রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে জানান, মোট ২২৯ জনকে বিচারের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, এই আইন মূলত ভিন্নমত দমন করতেই ব্যবহার করা হচ্ছে। মিয়ানমারে নির্বাচনসংক্রান্ত আইনে দোষী সাব্যস্ত হলে সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে। এমনকি নির্বাচনের সমালোচনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ‘হার্ট’ ইমোজি দেওয়ার কারণেও গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছে।
এ ছাড়া ব্যালট পেপার বা ভোটকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত করা, ভোটার বা নির্বাচনকর্মীদের ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগে সর্বোচ্চ ২০ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে অং সান সু চির প্রকৃত শারীরিক অবস্থা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে।
















