ইন্দো-প্যাসিফিকে সামরিক শক্তি জোরদারে ওয়াশিংটন, দক্ষিণ এশিয়ায় বাড়ছে কৌশলগত চাপ
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে সামরিক শক্তি বাড়ানোর ঘোষণা এসেছে। এই কৌশল দক্ষিণ এশিয়া ও বাংলাদেশের কূটনীতি, নিরাপত্তা ও বাণিজ্যে কী প্রভাব ফেলতে পারে—তা নিয়েই এই বিশ্লেষণ।
যুক্তরাষ্ট্রের সদ্য ঘোষিত ‘জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল ২০২৫’ ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলকে আবারও বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে। ইউরোপ যেখানে এই অঞ্চলে স্থিতিশীলতা, সমৃদ্ধি ও টেকসই উন্নয়নের ওপর জোর দিচ্ছে, সেখানে যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্টভাবে সামরিক শক্তি জোরদারের পথ বেছে নিয়েছে। এর মূল লক্ষ্য—তাইওয়ানকেন্দ্রিক ‘ফার্স্ট আইল্যান্ড চেইন’ সুরক্ষা এবং চীনের সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব সীমিত করা।
৫ ডিসেম্বর হোয়াইট হাউজ প্রকাশিত কৌশলপত্রে বলা হয়েছে, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলকে ‘মুক্ত ও উন্মুক্ত’ রেখে যুক্তরাষ্ট্র আগের মতো আর নিজের অর্থনৈতিক স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত করতে চায় না। বিশ্লেষকদের মতে, এটি চীনের সম্ভাব্য তাইওয়ান আগ্রাসন ঠেকানো এবং যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত প্রাধান্য বজায় রাখারই অংশ।
নতুন কৌশলে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির প্রতিফলন স্পষ্ট। যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপ, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়াসহ মিত্রদের প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়াতে এবং বন্দর ও সামরিক অবকাঠামো ব্যবহারে আরও বেশি সুযোগ দিতে আহ্বান জানিয়েছে। এতে করে ইন্দো-প্যাসিফিকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি আরও ঘনিষ্ঠ ও স্থায়ী করার পরিকল্পনার ইঙ্গিত মিলছে।
চীনের উত্থান মোকাবিলায় এশিয়ার মিত্রদের একত্রিত করাই এই কৌশলের মূল লক্ষ্য। ভারতকে এখানে ‘কেন্দ্রীয় কৌশলগত অংশীদার’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের নানা টানাপোড়েন সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র-ভারত নিরাপত্তা ও বাণিজ্য সহযোগিতা জোরদারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এতে ভারতের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব যেমন বাড়ছে, তেমনি দক্ষিণ এশিয়ার শক্তির ভারসাম্যও নতুন করে রূপ নিচ্ছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশকে বৃহত্তর ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের একটি ‘মূল অংশীদার’ হিসেবে দেখলেও মার্কিন কৌশলপত্রে বাংলাদেশের নাম সরাসরি উল্লেখ নেই। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এ অঞ্চলে সামরিক প্রতিযোগিতা তীব্র হলে বাংলাদেশও এর প্রভাব এড়াতে পারবে না। বাণিজ্য, নিরাপত্তা সহযোগিতা ও কূটনৈতিক ভারসাম্যে পরোক্ষ চাপ তৈরি হতে পারে, বিশেষ করে চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে।
কৌশলপত্রে ‘ফার্স্ট আইল্যান্ড চেইন’কে রক্ষার বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। জাপান, তাইওয়ান, ফিলিপাইন ও ইন্দোনেশিয়া নিয়ে গঠিত এই চেইন চীনা নৌবাহিনীর প্রশান্ত মহাসাগরে অবাধ প্রবেশ ঠেকানোর একটি কৌশলগত রেখা। যুক্তরাষ্ট্র বলছে, এই চেইনের যেকোনো স্থানে আগ্রাসন ঠেকাতে সক্ষম সামরিক বাহিনী গড়ে তোলা হবে, তবে তা এককভাবে নয়—মিত্রদের সক্রিয় অংশগ্রহণে।
এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে সামরিক উপস্থিতি আরও শক্তিশালী করার ঘোষণা দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এতে করে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে সংঘাত এড়ানোর কথা বলা হলেও বাস্তবে শক্তির প্রতিযোগিতা বাড়ার ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে।
বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো—এই পরিবর্তিত ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখা। যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্র হলে ঢাকা কীভাবে অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও কূটনীতির মধ্যে সমন্বয় করবে—তা আগামী দিনে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াতে পারে।
















