হংকংয়ের হাইকোর্ট গণতন্ত্রপন্থী কর্মী ও সংবাদপত্র উদ্যোক্তা জিমি লাইকে চীনের জাতীয় নিরাপত্তা ক্ষুণ্ন করার ষড়যন্ত্রের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করেছে। বহুল আলোচিত এই মামলায় তিনটি অভিযোগে দোষী প্রমাণিত হওয়ায় তার যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
সোমবার সকালে তিন বিচারকের একটি বেঞ্চ ৭৮ বছর বয়সী জিমি লাইকে বিদেশি শক্তির সঙ্গে যোগসাজশ করে জাতীয় নিরাপত্তা হুমকির দুইটি অভিযোগ এবং উসকানিমূলক লেখা প্রকাশের ষড়যন্ত্রের একটি অভিযোগে দোষী ঘোষণা করেন। বিচারক প্যানেলে ছিলেন এস্থার তো, অ্যালেক্স লি এবং সুসানা ডি’আলমাদা রেমেদিওস।
লাই সব অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন। ২০২০ সালের ডিসেম্বর থেকে তিনি কারাগারে রয়েছেন। ওই বছর হংকংজুড়ে সরকারবিরোধী আন্দোলনের সময় তাকে প্রথম গ্রেপ্তার করা হয়। এই মামলাকে হংকংয়ের ‘এক দেশ, দুই ব্যবস্থা’ নীতির বাস্তব পরীক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
১৯৯৭ সালে যুক্তরাজ্যের কাছ থেকে চীনের কাছে হংকং হস্তান্তরের সময় এই নীতির মাধ্যমে অঞ্চলটিকে আলাদা প্রশাসনিক ও শাসনব্যবস্থার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেইজিংয়ের প্রভাব বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সেই স্বায়ত্তশাসন ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে বলে দাবি করছেন মানবাধিকারকর্মীরা।
রায়ে বিচারক এস্থার তো বলেন, জিমি লাই নিয়মিতভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে চীন ও দেশটির কমিউনিস্ট পার্টির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে আহ্বান জানিয়েছেন। ৮৫৫ পৃষ্ঠার রায়ে আদালত তাকে এই ষড়যন্ত্রের মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে উল্লেখ করে।
বিচারক তো বলেন, প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের দীর্ঘ সময় ধরে লাই চীনের প্রতি ক্ষোভ ও বিদ্বেষ পোষণ করেছেন—এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
রায়ের পর মানবাধিকার ও গণমাধ্যম স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্সের মহাপরিচালক থিবো ব্রুটাঁ বলেন, সাজানো জাতীয় নিরাপত্তা অভিযোগে জিমি লাইকে দোষী সাব্যস্ত করা একটি অবৈধ ও উদ্বেগজনক সিদ্ধান্ত। তার মতে, এই রায় হংকংয়ে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ভয়াবহ অবনমনকে স্পষ্ট করে তুলেছে।
কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টসও এই রায়কে নিপীড়নের উদাহরণ বলে আখ্যা দিয়েছে। সংগঠনটির এশিয়া-প্যাসিফিক পরিচালক বেহ লিহ ই বলেন, এই রায় হংকংয়ের সংবিধানিক নথি বেসিক ল–এ নিশ্চিত করা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রতি চরম অবজ্ঞা প্রদর্শন করে। তার ভাষায়, জিমি লাইয়ের একমাত্র অপরাধ হলো একটি সংবাদপত্র পরিচালনা করা এবং গণতন্ত্রের পক্ষে অবস্থান নেওয়া।
আগামী ১২ জানুয়ারি সাজা ঘোষণার আগের শুনানির জন্য লাইকে আবার আদালতে হাজির করা হবে। তিনি এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবেন কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
১৫৬ দিন ধরে চলা এই বিচারে জিমি লাই নিজে ৫২ দিন সাক্ষ্য দেন। তিনি আদালতে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে চীনের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানানোর অভিযোগ সঠিক নয়।
২০২০ সালে প্রণীত হংকংয়ের জাতীয় নিরাপত্তা আইনের আওতায় এই অভিযোগ আনা হয়। ওই আইন সরকারবিরোধী আন্দোলনের মধ্যেই কার্যকর করা হয় এবং বিচ্ছিন্নতাবাদ বা সরকারবিরোধী কর্মকাণ্ডের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়।
জিমি লাইয়ের মালিকানাধীন অ্যাপল ডেইলি পত্রিকাটি ১৯৯৫ সালে যাত্রা শুরু করে এবং দ্রুতই হংকংয়ের সবচেয়ে প্রভাবশালী গণতন্ত্রপন্থী দৈনিকে পরিণত হয়। বিচারে পত্রিকাটির ১৬১টি লেখা প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
২০২০ সালের আগস্টে জাতীয় নিরাপত্তা আইন কার্যকর হওয়ার দুই মাসের মধ্যেই লাইকে প্রথম গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তী সময়ে একাধিকবার গ্রেপ্তার ও মুক্তির পর তিনি কারাবন্দি থাকেন। ২০২১ সালে কর্তৃপক্ষ অ্যাপল ডেইলির সম্পদ জব্দ করে এবং একই বছরের জুনে পত্রিকাটির শেষ সংখ্যা প্রকাশিত হয়।
লাইয়ের পরিবার ও আইনজীবীরা তার বয়স ও শারীরিক অসুস্থতার কথা উল্লেখ করে আদালতের কাছে মানবিক বিবেচনার আবেদন জানিয়ে আসছেন। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনের বিভিন্ন নেতা জিমি লাইয়ের মুক্তির আহ্বান জানিয়েছিলেন।
















