বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসর আবারও দোরগোড়ায়। মাত্র ছয় মাস পর শুরু হচ্ছে ২৩তম ফিফা বিশ্বকাপ—ইতিহাসের সবচেয়ে বিস্তৃত, সবচেয়ে দীর্ঘ এই টুর্নামেন্টকে সামনে রেখে আয়োজনকারী তিন দেশ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো ইতোমধ্যেই শেষ প্রস্তুতির পথে।
৪৮ দলের নতুন ফরম্যাটে এবার সবকিছুই আরও বড়, আরও ব্যস্ত, আরও উত্তেজনায় ভরপুর। ইতোমধ্যে ৪২টি দল নিশ্চিত করেছে জায়গা, দুই মিলিয়নেরও বেশি টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে, আর ১৬টি আয়োজক শহর তাদের স্টেডিয়াম ও আশপাশের অবকাঠামো সাজিয়ে তুলছে উৎসবের রঙে।
টুর্নামেন্ট শুরু হবে ১১ জুন, মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক আস্তেকা স্টেডিয়ামে স্বাগতিকদের মুখোমুখি হবে দক্ষিণ আফ্রিকা। দীর্ঘ ৩৯ দিনের লড়াই শেষে চূড়ান্ত পরিণতি লেখা হবে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে, যেখানে অনুষ্ঠিত হবে ফাইনাল।
যুক্তরাষ্ট্র ১১টি শহরে ম্যাচ আয়োজন করবে—আটলান্টা, বোস্টন, ডালাস, হিউস্টন, কানসাস সিটি, লস অ্যাঞ্জেলেস, মায়ামি, নিউ জার্সি/নিউইয়র্ক, ফিলাডেলফিয়া, সিয়াটল ও সান ফ্রান্সিসকো বে এরিয়া। কানাডায় টরন্টো ও ভ্যাঙ্কুভারে মোট ১৩টি ম্যাচ, আর মেক্সিকোর মেক্সিকো সিটি, গুয়াদালাহারা ও মন্টেররেতে আরও ১৩টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে।
যে স্টেডিয়ামগুলোর প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন ছিল, সেগুলোও এখন প্রায় প্রস্তুত। বোস্টনের ৬৩ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার স্টেডিয়ামে ২২৫ মিলিয়ন ডলারের সংস্কার চলছে, টরন্টোর স্টেডিয়ামও বাড়তি সক্ষমতায় নবায়ন করা হচ্ছে।
গত বিশ্বকাপের স্বপ্নঘেরা অধ্যায়ের নায়ক আর্জেন্টিনা এবারের আসরের শিরোপাধারী। স্পেন ফিফা র্যাংকিংয়ে শীর্ষে থেকে জোরালো দাবিদার, আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স, ব্রাজিল, পর্তুগাল, ইংল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, জার্মানি, কলম্বিয়া, মরক্কো—সবাই নিজ নিজ সম্ভাবনা নিয়ে মাঠে নামবে। নরওয়ে, উরুগুয়ে ও মিশরও ভাগ্য অনুকূলে পেলে বিস্ময় ঘটাতে পারে।
এবারের বিশ্বকাপে লিওনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো—এই দুই কিংবদন্তিকেই হয়তো দেখা যাবে শেষবারের মতো। বয়স ৩৮ আর ৪০, তবু তাঁরা আবারও ফুটবল দুনিয়াকে মাতিয়ে তুলতে প্রস্তুত।
এখনো ৬টি দলের জায়গা বাকি। মার্চে অনুষ্ঠিত হবে আন্তমহাদেশীয় প্লে-অফ, যেখানে ডিআরসি ও ইরাক অপেক্ষা করবে সেমিফাইনাল জয়ীদের জন্য। ইউরোপের বাকি চারটি টিকিট নির্ধারিত হবে ১৬ দলের কঠিন প্লে-অফে।
৪৮ দলের নতুন ফরম্যাটে থাকবে ১২টি গ্রুপ, সেখান থেকে উঠে আসবে ৩২টি দল—এ যেন আরেক পৃথিবী, আরেক সম্ভাবনার গল্প। ১৯৯৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে যখন মাত্র ২৪ দল খেলেছিল, আজ সেই গল্প দ্বিগুণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ফুটবলের মহাবিস্ময়ের সামনে।
সম্ভাব্য গ্রুপগুলোর তালিকা ইতোমধ্যে তৈরি, যদিও এখনো ছয়টি জায়গা অপেক্ষমাণ। প্রতিটি গ্রুপে লুকিয়ে আছে নাটক, প্রতিশোধ, উত্তেজনা আর ফুটবলের অনন্ত সৌন্দর্য।
আয়োজক যুক্তরাষ্ট্রে নিরাপত্তা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কও পেছনে ফেলেনি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। তবে আয়োজনকারীরা আশাবাদী—আবহাওয়ার চ্যালেঞ্জ, গরম কিংবা বজ্রঝড়—সবকিছু সামলেই তারা ফুটবলের উৎসবকে পৌঁছে দিতে চায় নিরাপদ ও পূর্ণাঙ্গ পরিণতিতে। কয়েকটি স্টেডিয়ামের ছাদ থাকবে বন্ধ, যাতে তাপ ও ঝড় কোনোটিই উৎসবকে বাধা দিতে না পারে।
টিকিটের মূল ব্যালট খুলছে এই বৃহস্পতিবার, চলবে ১৩ জানুয়ারি পর্যন্ত। এরপর লটারি ঠিক করবে কার ভাগ্যে ফুটবে মাঠের আলো।
মুহূর্তগুলো দিন গুনছে—গ্যালারিতে বসে কেউ স্লোগান তুলবে, কেউ কান্না লুকোবে, কেউ সম্ভাবনার স্বপ্ন দেখবে। ২০২৬ বিশ্বকাপ আবারও দেখিয়ে দেবে—ফুটবল শুধু খেলা নয়, একেকটি ম্যাচ যেন মানুষের হৃদয়ের স্পন্দন, সীমান্ত পেরিয়ে এক ভাষায় মিলেমিশে থাকা আবেগের নাম।
















