ইসরায়েলে টানা ২৩ বছরেরও বেশি সময় ধরে কারাগারে থাকা জনপ্রিয় ফিলিস্তিনি নেতা মারওয়ান বারঘুতির মুক্তির দাবিতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে জোরালো হয়ে উঠেছে আন্দোলন। বারঘুতির পরিবার চালু করা “ফ্রি মারওয়ান” অভিযানে সাড়া দিয়ে মার্গারেট অ্যাটউড থেকে শুরু করে হাভিয়ের বারদেমসহ দুই শতাধিক বিশ্বখ্যাত ব্যক্তিত্ব যুক্ত হয়েছেন।
বুধবার প্রকাশিত এক খোলা চিঠিতে বলা হয়, “আমরা মারওয়ান বারঘুতির অব্যাহত আটক, তাকে দেওয়া নির্মম নির্যাতন এবং তার আইনি অধিকার অস্বীকার নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছি।” চিঠিতে জাতিসংঘসহ বিশ্ব নেতাদের বারঘুতির মুক্তির পক্ষে দাঁড়ানোর আহ্বান জানানো হয়েছে।
এর আগে থেকেই অনেক স্বনামধন্য শিল্পী ও লেখক গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ বন্ধে সক্রিয় ছিলেন। কিন্তু এবার নতুন এই আবেদনটি আরও সংগঠিত আন্তর্জাতিক প্রচারের অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যার নেতৃত্ব দিয়েছে বারঘুতির পরিবার।
২০০২ সাল থেকে পাঁচটি যাবজ্জীবন সাজা ভোগ করছেন ৬৬ বছর বয়সী বারঘুতি। দ্বিতীয় ইন্তিফাদার সময় সংঘটিত হামলার অভিযোগে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল। তবুও ফাতাহ দলের এই শীর্ষ নেতাকে অনেকে “ফিলিস্তিনের নেলসন ম্যান্ডেলা” হিসেবে দেখেন—যিনি বিভিন্ন রাজনৈতিক বিভক্তিকে একত্রিত করতে সক্ষম এক বিরল ব্যক্তিত্ব।
এ বছর আগস্টে ইসরায়েলের চ্যানেল ১২-তে প্রচারিত এক ভিডিওতে দেখা যায়, চরম দক্ষিণপন্থী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির তার সেলের সামনে দাঁড়িয়ে বারঘুতিকে তাচ্ছিল্য করে বলছেন, “তুমি জিতবে না।” বহু বছর পর বারঘুতির এটাই ছিল প্রথম প্রকাশ্য দৃশ্য, আর তার ক্লান্ত, ক্ষয়িষ্ণু চেহারা পরিবারকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছিল।
অক্টোবরে তার ছেলেও অভিযোগ করেন, সাম্প্রতিক স্থানান্তরের সময় ইসরায়েলি কারারক্ষীরা তার বাবাকে বেধড়ক পেটায়। এতে বারঘুতির চারটি পাঁজর ভেঙে যায় এবং মাথায় গুরুতর আঘাত লাগে। পরিবারের আশঙ্কা—এই নির্যাতনের মধ্যেই হয়তো একদিন কারাগারের ভেতরেই শেষ হয়ে যেতে পারে তার জীবন।
তাই নানা দেশে অনুষ্ঠিত সমাবেশ, মানববন্ধন ও আলোচনার মধ্য দিয়ে বিশ্বব্যাপী শুরু হয়েছে “ফ্রি মারওয়ান” প্রচারণা—যুক্তরাজ্য, ফ্রান্সসহ আরও অনেক দেশে একের পর এক কর্মসূচি চলছে।
ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রসৃষ্টির সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ রূপরেখায়ও বারঘুতির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। তাকে অনেকেই দেখেন ফিলিস্তিনের শেষ আশার প্রতীক হিসেবে—একজন নেতা যিনি জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারেন।
অক্টোবরে পরিচালিত পিপিসিএসআর জরিপে দেখা যায়, যদি এখনই ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তবে বিপুল ব্যবধানে জয়ী হবেন মারওয়ান বারঘুতি। দ্বিতীয় স্থানে থাকবে হামাস, আর প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস থাকবেন অনেক পিছনে।
দুই দশক ধরে ক্ষমতায় থাকা আব্বাসের প্রশাসনকে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি দখলের ‘সহযোগী’ হিসেবে দেখছে বহু ফিলিস্তিনি। সেখানে প্রতিদিনই চলছে সেনাবাহিনীর হামলা, দখল ও বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা—এক অন্ধকার বাস্তবতায়।
তবুও আব্বাস যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত ২০ দফা পরিকল্পনার আলোকে যুদ্ধ-পরবর্তী গাজা শাসনব্যবস্থায় ভূমিকা নেওয়ার চেষ্টা করছে এবং ঘোষণা করেছেন, যুদ্ধ শেষ হলে এক বছরের মধ্যে হবে আইনসভা ও প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। কিন্তু জনগণ এতে আস্থা পাচ্ছে না। জরিপে অংশ নেওয়া ৬০ শতাংশ মানুষ বিশ্বাস করেন না যে নির্বাচন সত্যিই হবে।
ফিলিস্তিনি সমাজের গভীর হতাশা, ক্রোধ ও স্বপ্নের ভেতরেই আজ আবার জেগে উঠেছে এক পুরোনো আহ্বান—মারওয়ান বারঘুতিকে মুক্তি দাও। কারণ তার মুক্তিই হয়তো একদিন ফিলিস্তিনকে নিয়ে আসতে পারে নতুন আলোর পথে, মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় ভরপুর এক ভবিষ্যতের দিকে।
















