খেলাপি ঋণ ও শাসনব্যবস্থার ধসে ৯ এনবিএফআই লিকুইডেশনে; আমানতকারীদের সুরক্ষায় ৫ হাজার কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ।
বাংলাদেশ ব্যাংক ‘রেজুলিউশন অর্ডিন্যান্স–২০২৫’ অনুযায়ী ৯ আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধের অনুমোদন দিয়েছে। খেলাপি ঋণে বিপর্যস্ত এসব প্রতিষ্ঠানের আমানত ফেরত দিতে সরকার বিশেষ বরাদ্দ দিচ্ছে।
বাংলাদেশের ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) খাতের দীর্ঘদিনের অনিয়ম, দুর্বল শাসনব্যবস্থা এবং অস্বাভাবিক মাত্রার খেলাপি ঋণের জটিলতা অবশেষে কঠোর পদক্ষেপে নিয়ে এসেছে বাংলাদেশ ব্যাংককে। ‘ব্যাংক রেজুলিউশন অর্ডিন্যান্স–২০২৫’ এর আওতায় ৯টি এনবিএফআই আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ (অবসায়ন) করার চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বোর্ড।
রবিবার গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বোর্ড সভায় খাতটির স্থিতিশীলতা ফেরাতে এই ইতিহাসসৃষ্ট সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
যে ৯টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হচ্ছে
- এফএএস ফাইন্যান্স
- বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি (বিআইএফসি)
- প্রিমিয়ার লিজিং
- ফারইস্ট ফাইন্যান্স
- জিএসপি ফাইন্যান্স
- প্রাইম ফাইন্যান্স
- আভিভা ফাইন্যান্স
- পিপলস লিজিং
- ইন্টারন্যাশনাল লিজিং
বোর্ড অনুমোদনের ফলে বাংলাদেশ ব্যাংক এখন লিকুইডেটর নিয়োগ, সম্পদ বিক্রি এবং প্রাপ্ত অর্থ পাওনাদারদের মধ্যে বণ্টনসহ পূর্ণ অবসায়ন প্রক্রিয়া শুরু করতে পারবে।

এই ৯ প্রতিষ্ঠানের দায়েই রয়েছে খাতের মোট খেলাপি ঋণের ৫২ শতাংশ—যার পরিমাণ গত বছরের শেষে দাঁড়ায় ২৫ হাজার ৮৯ কোটি টাকা। আট প্রতিষ্ঠানের শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য ঋণাত্মক ৯৫ টাকা পর্যন্ত নেমে যাওয়ায় সরকারি হস্তক্ষেপ ছাড়া দায় পরিশোধ অসম্ভব বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আমানতকারীদের সুরক্ষায় সরকারের বিশেষ বরাদ্দ
বছরের পর বছর আমানত ফেরত না পাওয়ায় গ্রাহকদের ক্ষোভ ছিল তীব্র। কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানায়, ৯ প্রতিষ্ঠানে মোট আটকে থাকা আমানত ১৫ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যক্তির আমানত ৩,৫২৫ কোটি টাকা এবং করপোরেট ও ব্যাংক আমানত ১১,৮৪৫ কোটি টাকা।
গভর্নর মনসুর বলেন,
“লিকুইডেশন শুরুর আগে আমানতকারীদের পাওনা ফেরত দেওয়া হবে। সরকার প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা ফেরত দেওয়ার মৌখিক অনুমোদন দিয়েছে।”
সবচেয়ে বেশি আটকে থাকা আমানত রয়েছে:
- পিপলস লিজিং: ১,৪০৫ কোটি
- আভিভা ফাইন্যান্স: ৮০৯ কোটি
- ইন্টারন্যাশনাল লিজিং: ৬৪৫ কোটি
- প্রাইম ফাইন্যান্স: ৩২৮ কোটি
- এফএএস ফাইন্যান্স: ১০৫ কোটি
দুর্বল ব্যবস্থাপনার দীর্ঘ ইতিহাস
বিশেষজ্ঞরা জানান, অস্বচ্ছ আর্থিক বিবরণী, সম্পদ ফুলিয়ে দেখানো, লোকসান আড়াল করা এবং দীর্ঘমেয়াদি অনিয়মের কারণে এনবিএফআই খাত ধীরে ধীরে অচল অবস্থায় পৌঁছায়। ১০ মাসের মূল্যায়নে ২০ প্রতিষ্ঠানকে ‘লাল ক্যাটাগরি’তে চিহ্নিত করা হয়; সেখান থেকেই ৯টি প্রতিষ্ঠান বন্ধের জন্য নির্বাচন করা হয়েছে।
অন্যান্য ১১ দুর্বল প্রতিষ্ঠানের তালিকায় রয়েছে—
সিভিসি ফাইন্যান্স, বে লিজিং, ইসলামিক ফাইন্যান্স, মেরিডিয়ান ফাইন্যান্স, হজ ফাইন্যান্স, ন্যাশনাল ফাইন্যান্স, আইআইডিএফসি, উত্তরা ফাইন্যান্স, ফিনিক্স ফাইন্যান্স, ফার্স্ট ফাইন্যান্স ও ইউনিয়ন ক্যাপিটাল।
এর আগে পাঁচটি দুর্বল শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠনের সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। বিশ্লেষকদের মতে, একীভূতকরণ ও অবসায়ন—উভয় নির্দেশই স্পষ্ট করছে যে অনিয়ম আর প্রশ্রয় পাবে না।
















