সুদানে ২০২৩ সালের এপ্রিলে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু হওয়ার বহু আগেই দেশটি রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সামরিক দ্বন্দ্বে বিপর্যস্ত ছিল। ওমর আল-বশির সরকারের দীর্ঘ স্বৈরশাসন একদিকে দুর্বল অর্থনীতি, অন্যদিকে ভাঙা নিরাপত্তা কাঠামো ও আধাসামরিক গোষ্ঠীর প্রভাবকে আরও গভীর করে তোলে। বশির পতনের পর সামরিক–বেসামরিক অন্তর্বর্তী সরকারও প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করতে ব্যর্থ হয়। ফলে সুদানি সেনাবাহিনী (SAF) ও দ্রুত সহায়তা বাহিনীর (RSF) মধ্যে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা রূপ নেয় রক্তক্ষয়ী সংঘাতে।
যেখানে দেশটিতে সহিংসতা ও বাস্তুচ্যুতি বেড়েছে, সেখানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নীতিগুলোও অনিচ্ছাকৃতভাবে এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। প্রায় এক দশক ধরে ইইউ আফ্রিকা থেকে ইউরোপে অভিবাসন ঠেকাতে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ জোরদার করার নামে আফ্রিকান দেশগুলোকে সহায়তা, প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জাম দিয়ে আসছিল। কিন্তু সুদানে এই সহায়তা পৌঁছায় এমন সব নিরাপত্তা কাঠামোর কাছে, যাদের অনেক অংশ পরবর্তীতে RSF–এ মিশে যায়।
২০১৪ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ইইউ ‘ইইউ জরুরি তহবিল’ ও ‘বেটার মাইগ্রেশন ম্যানেজমেন্ট’ কর্মসূচির মাধ্যমে সুদানে ঢালে ২০০ মিলিয়ন ইউরোরও বেশি। আনুষ্ঠানিকভাবে এগুলো সীমান্ত নিরাপত্তা ও মানবপাচার রোধের জন্য হলেও বাস্তবে ইইউ অর্থ ও প্রশিক্ষণে সুদানের নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। ২০১৭ সালে এনায়াফ প্রজেক্টের এক প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়—ইইউ–র সহায়তা RSF–এর মতো মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী বাহিনীকে আরও শক্তিশালী করবে।
২০১৯ সালে ইইউ স্বীকার করে যে তহবিল ভুল হাতে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। কিন্তু তবুও ইউরোপের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়, RSF–কে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে তহবিল দেওয়া হয়নি। প্রশ্ন ওঠে—ঝুঁকি জানা সত্ত্বেও কেন ইইউ এমন দুর্বল নিয়ন্ত্রণ–ব্যবস্থার দেশে এত অর্থ ঢালল?
শুধু অর্থই নয়, ইউরোপীয় অস্ত্রও ঘুরপথে পৌঁছায় সুদানের যুদ্ধক্ষেত্রে। ২০২৪ সালে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তদন্তে দেখা যায়, ফরাসি তৈরি Galix প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যুক্ত সাঁজোয়া যান RSF দারফুরে ব্যবহার করছে—যা জাতিসংঘের অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গ করে। একই বছর ফ্রান্স২৪ ও রয়টার্স ৮১ মিমি মর্টারের শেল উদ্ধার করে, যেগুলো বুলগেরিয়ায় তৈরি এবং অনুমতি ছাড়াই সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে সুদানে পৌঁছায়।
২০২৫ সালে দ্য গার্ডিয়ানের আরেক অনুসন্ধানে উঠে আসে, ব্রিটিশ সামরিক যন্ত্রাংশও RSF–এর হাতে পৌঁছেছে—সেগুলোও আবার আমিরাতের মাধ্যমেই। যদিও ইউএই সরবরাহের অভিযোগ অস্বীকার করে, তাদের হয়ে অস্ত্র পুনরায় রপ্তানির ঘটনা বহুবার প্রমাণিত হয়েছে।
ইইউ ও যুক্তরাজ্যের আইন অনুযায়ী, অস্ত্র কোথায় যাচ্ছে তা নিয়ে ঝুঁকি থাকলে রপ্তানি লাইসেন্স বন্ধ করা উচিত। কিন্তু ব্রিটেন ২০২৫ সালের মাঝামাঝি আমিরাতের জন্য আবারও ২২৭ মিলিয়ন ডলারের সামরিক রপ্তানি অনুমোদন দেয়—যদিও জানত যে তাদের ব্যবস্থাপনায় থাকা অস্ত্র সুদানে পৌঁছাতে পারে।
দক্ষিণ আফ্রিকাও একই ধরনের সমালোচনার মুখে পড়ে। ইয়েমেনে সৌদি–আমিরাত জোটের হাতে তাদের তৈরি অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। পরে দেশটি রপ্তানি শর্ত কঠোর করলেও অস্ত্র সংক্রান্ত চুক্তি বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ থেকেই যায়—এমনকি সুদানেও দক্ষিণ আফ্রিকার অস্ত্র ব্যবহারের প্রমাণ মিলেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতি স্পষ্ট—ইউরোপের অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ নীতি ও দুর্বল অস্ত্র রপ্তানি তদারকি সুদানের যুদ্ধকে আরও ভয়াবহ করেছে। তাই ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্যের উচিত রপ্তানি–পরবর্তী নজরদারি জোরদার করা, দায়বদ্ধতার স্বচ্ছতা প্রকাশ করা এবং ঝুঁকি থাকলে নতুন লাইসেন্স বন্ধ করা।
অন্যথায়, নিরাপত্তা রক্ষার নামে নেওয়া পদক্ষেপই উল্টো অস্থিতিশীলতা বাড়াবে—এমনই সতর্কবার্তা জানিয়েছেন বিশ্লেষকরা।
















