টিকাদান কর্মসূচি স্থবির, সমন্বয়হীনতায় নিয়ন্ত্রণে ভাটা
রাজধানীতে বেওয়ারিশ কুকুরের আক্রমণ বাড়ছে, বাড়ছে জলাতঙ্কের ঝুঁকি। টিকাদান কর্মসূচি বন্ধ ও সমন্বয়হীনতায় উদ্বেগ বাড়ছে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যে।
রাজধানীতে বেওয়ারিশ কুকুরের কামড় ও আঁচড়ে আক্রান্তের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে, সঙ্গে বাড়ছে প্রাণঘাতী জলাতঙ্কের ঝুঁকিও। সর্বশেষ গত ১৫ এপ্রিল ঢাকার উত্তরখানে তিন বছর বয়সী শিশু আনাস কুকুরের কামড়ে আহত হয়।
শিশুটির হাতে খাবার দেখে কাছে আসে একটি কুকুর। ভয় পেয়ে দৌড় দিলে কুকুরটি ঝাঁপিয়ে পড়ে তার বাঁ হাতে কামড় দেয়। পরে তাকে দ্রুত মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং জলাতঙ্ক প্রতিরোধী টিকা দেওয়া হয়।
রোগী বাড়ছে ধারাবাহিকভাবে
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, কুকুর ও বিড়ালের আক্রমণে আহত হয়ে চিকিৎসা নেওয়া মানুষের সংখ্যা প্রতিবছরই বাড়ছে।
- ২০২৩ সালে: ৯৪,৩৮০ জন
- ২০২৪ সালে: ১,২২,২৬৩ জন
- ২০২৫ সালে: ১,৪৬,২৪৩ জন
- ২০২৬ সালের ১৭ মার্চ পর্যন্ত: ৩৬,৭৫১ জন
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, রোগীর এই ঊর্ধ্বগতির প্রধান কারণ বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং টিকাদান কর্মসূচির স্থবিরতা।
জলাতঙ্ক: লক্ষণ দেখা দিলে প্রায় নিশ্চিত মৃত্যু
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলাতঙ্ক এমন একটি রোগ, যার লক্ষণ প্রকাশ পেলে প্রায় শতভাগ ক্ষেত্রেই মৃত্যু ঘটে। তাই প্রতিরোধই একমাত্র কার্যকর উপায়।
তথ্য বলছে, দেশে জলাতঙ্কে মৃত্যুর সংখ্যাও আবার বাড়ছে—
- ২০২৩ সালে: ৪২ জন
- ২০২৪ সালে: ৫৮ জন
- ২০২৫ সালে: ৫৯ জন
- ২০২৬ সালের প্রথম আড়াই মাসে: ১৯ জন
টিকাদান কর্মসূচি কার্যত বন্ধ
২০১০ সাল থেকে দেশে জলাতঙ্ক নির্মূলের লক্ষ্যে কুকুরের টিকাদান, জন্মনিয়ন্ত্রণ ও জনসচেতনতা কার্যক্রম চালু ছিল। এই কর্মসূচির আওতায় ৬০টির বেশি জেলায় প্রায় ২৯ লাখ কুকুরকে টিকা দেওয়া হয়েছিল।
তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অর্থসংকট ও পরিকল্পনার অভাবে এই কর্মসূচি প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে টিকা না পাওয়া কুকুরের সংখ্যা বাড়ছে এবং ঝুঁকিও বাড়ছে।
সমন্বয়হীনতায় অচল ব্যবস্থা
বেওয়ারিশ কুকুর নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের অভাব স্পষ্ট।
- স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কোনো সক্রিয় কর্মসূচি নেই
- প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরেরও নির্দিষ্ট উদ্যোগ নেই
- সিটি করপোরেশনগুলোর কার্যক্রম সীমিত ও অনিয়মিত
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের এক কর্মকর্তা বলেন, টিকা সরবরাহের অভাব ও সমন্বয়হীনতার কারণে নিয়মিত কার্যক্রম চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মত
বিশেষজ্ঞদের মতে, কার্যকর নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজন—
- কুকুরের ব্যাপক টিকাদান
- জন্মনিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদার
- জনসচেতনতা বৃদ্ধি
- সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ
তাদের মতে, শুধু মানুষকে টিকা দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়—কুকুরকেও টিকার আওতায় আনতে হবে।
















