হাজার বছরের ইতিহাসে দেখা যায়, মানুষ ছোট পরিসরে একত্র হয়ে খাবার ভাগাভাগি করে খেতে পছন্দ করে। বন্ধুদের সাথে বাহিরে খাওয়া, আড্ডার ডিনার পার্টি কিংবা উৎসবের জমায়েত—সমষ্টিগত খাওয়া এতটাই স্বাভাবিক যে এটি নিয়ে খুব কমই আলোচনা হয়। তবে পারিবারিক খাবারের পরিমাণ কমে যাওয়া নিয়ে সমাজে মাঝে মাঝে উদ্বেগ দেখা দেয়। গবেষণায়ও দেখা গেছে, বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় রয়েছে, যা প্রমাণ করে যে একসঙ্গে খাওয়া মানুষের সমাজজীবনে গভীর প্রভাব ফেলে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, একসঙ্গে খাবার ভাগ করে খাওয়ার অভ্যাস মানুষের উদ্ভবেরও আগের সময় থেকে শুরু। আমাদের নিকটাত্মীয় প্রাইমেট—চিম্পাঞ্জি ও বনোবোরাও তাদের দলের সদস্যদের সঙ্গে খাবার ভাগ করে। তবে উপসালা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানী নিক্লাস নিউম্যান জানান, খাবার বিতরণ করা আর একসঙ্গে বসে খাওয়া এক নয়। মানুষের ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়ায় জটিল সামাজিক আচরণ যুক্ত হয়েছে।
গবেষকদের ধারণা, প্রথম যৌথ খাবারটি হয়তো কোনো আগুনের পাশে বসে হয়েছিল। মানুষ ঠিক কখন রান্না করতে শিখেছিল তা নিশ্চিত নয়—অনুমান ১.৮ মিলিয়ন বছর আগেও হতে পারে। কিন্তু শিকার করা, খাবার সংগ্রহ, আগুন জ্বালানো এবং রান্না করা মিলিয়ে এটি একটি সামাজিক সহযোগিতার ব্যাপারই ছিল।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞানী রবিন ডানবার মনে করেন, আগুনের চারপাশে বসে খাওয়া মানুষকে দীর্ঘ সময় একসঙ্গে জাগিয়ে রাখত, যা সামাজিক বন্ধনকে আরও শক্তিশালী করত। তার ২০১৭ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, যারা বেশি ঘন ঘন অন্যদের সাথে খায়, তারা জীবনে বেশি সন্তুষ্ট এবং সামাজিকভাবে বেশি সমর্থন পায়। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এ ধরনের যৌথ খাবারই সামাজিক সম্পর্ক দৃঢ় করার পেছনে ভূমিকা রাখে।
ডানবার বলেন, খাওয়া মানুষের মস্তিষ্কে এন্ডরফিন নিঃসরণ বাড়ায়, যা সম্পর্ককে আরও ঘনিষ্ঠ করে। একসঙ্গে খাওয়ার সময় এই প্রভাব দ্বিগুণ হয়, ঠিক যেভাবে একসঙ্গে দৌড়ানোর সময় হয়।
গবেষণায় আরও দেখা যায়, একই খাবার ভাগাভাগি করে খেলে মানুষের মাঝে বিশ্বাসের মাত্রা বাড়ে। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের আইলেট ফিশব্যাচ দেখেছেন, একই ধরনের খাবার খেয়েছে এমন মানুষরা আর্থিক লেনদেন বা আলোচনায় দ্রুত সিদ্ধান্তে পৌঁছায়।
তবে যৌথ খাবার সব সময় ইতিবাচক অভিজ্ঞতা নাও হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে বড় ভোজকে নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্ব প্রদর্শনের উপায় হিসেবে ব্যবহার করা হয়—যেমন জমিদারের ফসল উৎসব বা অফিসের পার্টি। একইভাবে পারিবারিক খাবারেও সমালোচনা বা চাপ মানুষকে অস্বস্তিতে ফেলতে পারে।
নিউম্যানের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় সুইডেনের বয়স্ক মানুষদের নিয়ে দেখা গেছে, তারা একা খেতে খুব অসুবিধা বোধ করেন না। যদিও তারা অন্যদের সঙ্গে খেতে পছন্দ করেন, তবু একাকী খাবার তাদের জন্য খুব কষ্টকর নয়। তিনি ধারণা করেন, যারা আগেই একাকীত্বে ভোগেন, তারা একা খাওয়াকে বেশি নেতিবাচকভাবে অনুভব করতে পারেন।
তবে যারা নিয়মিত সঙ্গ দিয়ে খায়, তাদের মাঝে মাঝে একা বসে খাওয়াও আরামদায়ক মনে হতে পারে।
এই প্রতিবেদনটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২৭ নভেম্বর ২০২৪ সালে এবং পুনঃপ্রকাশিত হয় ২৭ নভেম্বর ২০২৫ সালে।















