জোহানেসবার্গের উজ্জ্বল প্রভাতে, আফ্রিকার মাটিতে প্রথমবারের মতো জি২০ নেতারা যখন একজোট হলেন, তখন যেন ইতিহাসের পাতায় নতুন এক অধ্যায় লেখা শুরু হলো। উন্নয়নশীল বিশ্বের দীর্ঘদিনের বেদনা, জলবায়ু বিপর্যয়ের ছোবল, আর ঋণের ভারে ন্যুব্জ দেশগুলোর আর্তি—সবকিছুকে সামনে রেখে ঘোষণা পত্রে উঠে এল মানবিক প্রতিশ্রুতির সুর।
এ বছরের শীর্ষ সম্মেলনটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কারণ যুক্তরাষ্ট্রের বয়কটের ছায়া পড়েছিল পুরো আয়োজনের ওপর। তবু বিশ্বের শীর্ষ ধনী ও উদীয়মান অর্থনীতির প্রতিনিধিরা দুই দিনের এই আলোচনায় অংশ নিতে হাজির হয়েছিলেন সোয়েটোর কাছে অবস্থিত সেই প্রাঙ্গণে, যেখানকার বাতাসে এখনও ধ্বনিত হয় নেলসন ম্যান্ডেলার মুক্তির গান।
সম্মেলনের চূড়ান্ত ঘোষণায় জানানো হয়—সুদান, কঙ্গো, ফিলিস্তিন এবং ইউক্রেনে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠায় কাজ করবে জি২০। পাশাপাশি উন্নয়নশীল দেশগুলোকে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলায় এবং ঋণের বোঝা লাঘবে সহায়তা দেওয়ার অঙ্গীকারও করা হয়েছে।
বিশ্বের ঝড়ঝাপটার কথা উল্লেখ করে ঘোষণা পত্রে বলা হয়, খরা, বন্যা এবং বিধ্বংসী দুর্যোগ সবচেয়ে বেশি আঘাত হানে দুর্বল মানুষদের ওপর, আর উচ্চ ঋণ অনেক দেশের অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তাই ঋণ পুনর্গঠন প্রক্রিয়া আরও দ্রুত, স্বচ্ছ এবং সমন্বিতভাবে বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেয় এই সম্মেলন।
ঘোষণায় আরও বলা হয়, খনিজ সম্পদ যেন শুধু কাঁচামাল হিসেবে রপ্তানি না হয়ে বরং উন্নয়নের হাতিয়ার হয়ে ওঠে—এ সংকল্পও প্রকাশ করেন নেতারা।
সভাপতি সিরিল রামাফোসা তাঁর উদ্বোধনী বক্তব্যে জানান, জি২০–এর মর্যাদা অটুট রেখে আফ্রিকা এবং বৈশ্বিক দক্ষিণের উন্নয়ন স্বপ্নকে সামনে আনা তাঁর দেশের অঙ্গীকার। যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছিল কোনো ঘোষণা না দিতে, কিন্তু রামাফোসা সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন দৃঢ় কণ্ঠে।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসও সম্মেলনের আগে বলেন, দক্ষিণ আফ্রিকা তার দায়িত্ব পালন করেছে, আলোচনার টেবিলে জরুরি বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। তবে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ধনী দেশগুলো অতীতে বহুবার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে, বিশেষত জলবায়ু সংকটে।
এই সম্মেলনের আগে যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ আফ্রিকার মধ্যে একটি তীব্র কূটনৈতিক টানাপোড়েন চলছিল। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিযোগ করেছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকা নাকি শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক নীতি অনুসরণ করছে—এক দাবি যা দক্ষিণ আফ্রিকা তীব্রভাবে অস্বীকার করেছে। সেই অভিযোগের জেরে যুক্তরাষ্ট্র পুরো সম্মেলন বর্জন করার সিদ্ধান্ত নেয়।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ট্রাম্পের অনুপস্থিতিকে দুঃখজনক বললেও জোর দিয়ে বলেন, পৃথিবীর সামনে যে অগণিত চ্যালেঞ্জ, তা মোকাবেলায় উপস্থিত নেতাদের একজোট হওয়াই জরুরি।
জি২০ আসলে ২১ সদস্যের একটি জোট—১৯টি দেশ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং আফ্রিকান ইউনিয়ন। ১৯৯৯ সালে গ্লোবাল আর্থিক সংকট মোকাবেলায় ধনী ও দরিদ্র দেশের সেতুবন্ধন হিসেবেই এর জন্ম। আজও বিশ্বের মোট অর্থনীতির ৮৫ শতাংশ, বাণিজ্যের ৭৫ শতাংশ এবং জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি জি২০–এর অন্তর্ভুক্ত।
কিন্তু জোটটি সিদ্ধান্ত নেয় ঐক্যমতের ভিত্তিতে, আর সেই ঐক্য পাওয়া কখনো সহজ হয় না—বিশেষ করে যখন একদিকে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ইউরোপ, অন্যদিকে চীন, ভারত, রাশিয়া এবং দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দেশগুলো ভিন্ন ভিন্ন স্বার্থ নিয়ে বসে।
তবু জোহানেসবার্গে সেই সকালটি এক নতুন সম্ভাবনার প্রতীক হয়ে উঠল—একের পর এক সংকটে জর্জরিত পৃথিবীতে উন্নয়নশীলদের পক্ষে দাঁড়ানোর প্রতিশ্রুতিতে ভর করে।
সম্মেলনের আলোয় যেন উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে একটাই বার্তা—বিশ্ব শুধু শক্তিধরদের নয়, দুর্বলদের উন্নয়নের পথও আলোকিত করতে হবে।
















