আফ্রিকার শিশুদের জন্য তৈরি নেসলের সেরেলাক খাদ্যে অতিরিক্ত চিনি যোগ করা হচ্ছে—একটি নতুন অনুসন্ধানে এমন অভিযোগ উঠতেই আন্তর্জাতিক পরিসরে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। সুইস মানবাধিকার পর্যবেক্ষক সংস্থা পাবলিক আই প্রকাশিত এই রিপোর্টে বলা হয়েছে, ধনী দেশগুলোতে যে স্বাস্থ্যমান কঠোরভাবে মানা হয়, আফ্রিকার বাজারে নেসলে সেই মানের প্রতি অবহেলা করছে।
প্রতিবেদনটি জানায়, আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে বিক্রি হওয়া বেশিরভাগ সেরেলাক নমুনায় অতিরিক্ত চিনি পাওয়া গেছে। অথচ ইউরোপে একই বয়সী শিশুদের জন্য নেসলের পণ্যগুলোতে কোনো চিনি যোগ করা হয় না। ২০২২ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্ক করেছিল, খুব অল্প বয়সে চিনি খাওয়া শিশুর ভেতরে মিষ্টির প্রতি দীর্ঘমেয়াদি ঝোঁক তৈরি করতে পারে এবং তাদের স্থূলতার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
নেসলের জন্মভূমি সুইজারল্যান্ডে যে শিশু খাদ্য বাজারজাত করা হয়, তার সামান্যতম অংশেও চিনি নেই। জার্মানি, যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও ছয় মাস বয়সী শিশুদের জন্য বিক্রি হওয়া খাদ্যে চিনি যোগ করা হয় না।
১৭ নভেম্বর নেসলের প্রধান নির্বাহীকে পাঠানো এক খোলা চিঠিতে আফ্রিকার ১৯টি নাগরিক সংগঠন এই পার্থক্যকে বলেছে “অমানবিক বৈষম্য”। তাদের ভাষায়, সুইস শিশুর জন্য অনুপযোগী চিনি আফ্রিকান শিশুর জন্য কীভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে। “সব শিশুই সমান পুষ্টির অধিকারী—ত্বক বা জন্মভূমি নয়, স্বাস্থ্যই তাদের পরিচয়,” উল্লেখ করা হয় চিঠিতে।
নেসলে অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তারা বলছে, এ প্রতিবেদন বিভ্রান্তিকর এবং ভিত্তিহীন। কোম্পানির দাবি, আফ্রিকা ও ইউরোপ—উভয় মহাদেশেই তারা একই দামের মধ্যে চিনি ছাড়া এবং চিনি-সংযুক্ত উভয় ধরনের পণ্য সরবরাহ করে। তাদের ভাষায়, বিশ্বের ৯৭ শতাংশ বাজারে ইতোমধ্যেই চিনি ছাড়া নতুন ধরন চালু হয়েছে এবং ২০২৫ সালের মধ্যে তা ১০০ শতাংশে উন্নীত হবে।
পাবলিক আই তাদের অনুসন্ধানে ২০টি দেশের প্রায় ১০০টি সেরেলাক পণ্য সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ করে। ফলাফলে দেখা যায়, ৯০ শতাংশ নমুনায় যোগ করা চিনি রয়েছে। গড়ে প্রতিটি পরিবেশনায় প্রায় ছয় গ্রাম চিনি পাওয়া গেছে, যা দেড় চিনি-খণ্ডের সমান। ছয় মাস বয়সী শিশুর জন্য কেনিয়ায় বিক্রি হওয়া একটি সেরেলাক পণ্যে পাওয়া গেছে সর্বোচ্চ ৭.৫ গ্রাম চিনি—প্রায় দুটো চিনি-খণ্ডের সমান।
এই পরিমাণ ২০২৪ সালে এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার বাজারে করা এক অনুসন্ধানের চেয়েও বেশি। ভারতের বাজারে পাওয়া পরিমাণের প্রায় দ্বিগুণ।
নেসলে দাবি করছে, তাদের লেবেলে উল্লেখিত চিনি পরিমাণ কঠোর পরীক্ষার মধ্য দিয়ে নির্ধারিত এবং সার্টিফায়েড ল্যাবরেটরির বিশ্লেষণের ওপর ভিত্তি করে। গত বছরের অনুসন্ধানের পর ভারতেও তারা ১৪টি নতুন চিনি ছাড়া সেরেলাক বাজারে এনেছে।
আফ্রিকাজুড়ে শিশুদের মধ্যে স্থূলতা বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য বলছে, পাঁচ বছরের কম বয়সী অতিরিক্ত ওজনের শিশুর সংখ্যা ১৯৯০ সালের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। একই সঙ্গে অপুষ্টি ও স্থূলতা পাশাপাশি বিরাজ করছে—একটি মহাদেশের কাছে এটি যেন দুই দিক থেকে চাপ।
নেসলে বলছে, আফ্রিকায় স্থূলতা বাড়লেও অপুষ্টিই সবচেয়ে তাৎক্ষণিক সংকট। তারা দাবি করে, যেখানেই পণ্য বিক্রি হোক না কেন, গুণগত মান ও নিরাপত্তায় তারা কোনো আপস করে না।
তবে নাগরিক সমাজগুলোর অভিযোগ আরও তীব্র। তাদের ভাষায়, “শিশু খাদ্যে চিনি যোগ করে নেসলে মুনাফার লোভে আফ্রিকান শিশুদের ভবিষ্যৎকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এটি বন্ধ করতে হবে—এখনই।”
















