যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ ঘোষণা করেছেন, দেশের আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য বর্তমান ব্যবস্থা আর কার্যকর নয়। তাঁর ভাষায়, অনিয়মিত প্রবেশ ও অসমাপ্ত আবেদন প্রক্রিয়া সম্প্রদায়গুলোকে চাপে ফেলে দিচ্ছে, ভেঙে দিচ্ছে সামাজিক সমন্বয়। তাই শিগগিরই আসছে এমন এক আইনি সংস্কার, যা শেষ করে দিতে পারে পাঁচ বছর পর স্থায়ীভাবে বসবাসের স্বয়ংক্রিয় অধিকার।
বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মাহমুদ বলেন, “অনিয়মিত অভিবাসন দেশটাকে ছিঁড়ে ফেলছে।” একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, নিরাপদ হলে শরণার্থীদের নিজ দেশে ফেরানোর পরিকল্পনাও থাকছে সরকারের ঘোষণায়।
ইতিমধ্যে নানা শহরে আশ্রয়প্রার্থীদের থাকা হোটেলের সামনে উত্তেজনা, লন্ডনে অভিবাসনবিরোধী শোভাযাত্রা—এ সমস্ত কিছু ঘিরেই কঠোর নীতি আনতে যাচ্ছে সরকার। নৌকায় ফ্রান্স থেকে আগত মানুষের সংখ্যা থামানোও এখন সরকারের অগ্রাধিকার।
অভিবাসনের বর্তমান অবস্থা
ব্রেক্সিটের পর অনিয়মিতভাবে যুক্তরাজ্যে প্রবেশকারী মানুষের সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত নেট অভিবাসন ছিল প্রায় ৯ লাখ। তবে ২০২৪ সালে সেই সংখ্যা অর্ধেকে নেমেছে, বিশেষত স্বাস্থ্যকর্মী ও শিক্ষার্থী ভিসা কমিয়ে দেওয়ার ফলে।
মিডিয়ার আলোচনায় ছোট নৌকা দিয়ে প্রবেশকারীরা প্রধান আলোচ্য হলেও, গত বছর আসলে মোট আশ্রয়আবেদনকারীর মাত্র এক-তৃতীয়াংশ এসেছে এ পথে। তবুও জনমনে অস্থিরতা কমেনি; এক জরিপ বলছে, অভিবাসন নীতিতে লেবারের ওপর মানুষের আস্থা কম, বরং অনেকেই কঠোর অবস্থানের দলগুলোকেই সক্ষম মনে করে।
কী বদল আসছে আশ্রয়নীতিতে
নতুন পরিকল্পনা স্থায়ী বসবাসের পথকে পাঁচ বছর থেকে বাড়িয়ে ২০ বছরে নেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। শরণার্থীদের প্রতি ৩০ মাস অন্তর দেখাতে হবে, তাদের দেশে ফেরানোর মতো পরিস্থিতি কি বদলেছে।
একই সঙ্গে সরকার আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য বাধ্যতামূলক বাসস্থান ও ভাতার দায়িত্ব প্রত্যাহার করতে চায়। যারা কাজ করতে সক্ষম বা কোনো অপরাধে জড়িত, তাদের জন্য সহায়তা আরও কঠোরভাবে সীমিত হবে।
শরণার্থী অধিকার সংগঠনগুলোর উদ্বেগ
রিফিউজি কাউন্সিলের প্রধান এনভার সলোমন বলছেন, এই পরিবর্তন মানুষকে নিরাপত্তা দেবে না; বরং দীর্ঘ অনিশ্চয়তার ভয়ে তাদের জীবনকে গ্রাস করবে। তাঁর মতে, মানবিকতার ভিত্তিতে দ্রুত ও ন্যায্য সিদ্ধান্তই হওয়া উচিত আশ্রয় ব্যবস্থার মূলমন্ত্র।
ডেনমার্কের কঠোর নীতির অনুকরণে যুক্তরাজ্যের এই পরিবর্তন বাস্তবে কতটুকু কার্যকর হবে, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছে গবেষক ও নীতিবিশ্লেষকরা।
আর কোন প্রস্তাব আসছে
সরকার পরিচয়পত্র ছাড়া আগতদের বয়স নির্ধারণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে। কিন্তু মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, এটি ভুল সিদ্ধান্ত বাড়াবে, শিশুদের ভুলভাবে প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে গণ্য করে বিপদে ফেলতে পারে।
একই সঙ্গে অ্যাঙ্গোলা, নামিবিয়া ও কঙ্গোর ভিসা আবেদন স্থগিত করার হুমকিও এসেছে, যদি তারা যুক্তরাজ্যে থাকা নাগরিকদের ফেরত নিতে সহযোগিতা না করে।
পরিবার জীবনের অধিকার সম্পর্কিত আইনের ব্যাখ্যাটিও পরিবর্তনের পথে। নিকট আত্মীয় ছাড়া অন্য কাউকে আর “পারিবারিক সংযোগ” হিসেবে বিবেচনা নাও করা হতে পারে।
ইউক্রেন ও অন্যান্য দেশের মানুষ
যুদ্ধ থেকে পালানো ইউক্রেনীয়দের জন্য বর্তমান বিশেষ ব্যবস্থাই থাকবে, তবে যুদ্ধ শেষ হলে তাদের ফিরতে হবে—এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
আফগানিস্তান থেকে ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের জন্যও পুনর্বাসন কর্মসূচি চালু আছে। হংকংয়ের ব্রিটিশ ন্যাশনাল ওভারসিজ ধারীদের জন্যও যুক্তরাজ্যের দরজা খোলা।
নতুন নিরাপদ পথ কি আসবে
সরকার জানিয়েছে, বিপজ্জনক পথ বেছে নেওয়া মানুষ কমাতে নতুন বৈধ প্রবেশপথ উন্মুক্ত করা হবে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলছে, নিরাপদ পথ কম থাকলেই মানুষ বাধ্য হয় ঝুঁকিপূর্ণ উপায়ে আসতে। পরিবার পুনর্মিলন, কমিউনিটি স্পনসরশিপ কিংবা সীমিত পুনর্বাসন—এসব পথ সম্প্রসারণ করা জরুরি।
মানবিকতার দাবি আজ একটাই—যারা আশ্রয় খুঁজতে এসেছে, তাদের জন্য ন্যায্যতা, নিরাপত্তা ও একটি স্থির ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা। কঠোরতার দেয়াল যতই উঁচু হোক, মানবতার দরজা বন্ধ হওয়া উচিত নয়।
















