ব্রাজিলের বেলেম শহরের রাস্তায় রাস্তায় শনিবার নেমে আসে হাজারো মানুষের ঢেউ। আদিবাসী জনগোষ্ঠী আর পরিবেশরক্ষার সংগ্রামী কণ্ঠ একাকার হয়ে তারা দাবি তোলে, জাতিসংঘের কপ ত্রিশ জলবায়ু সম্মেলনে যেন শোনা যায় তাদের বেদনার চিৎকার, তাদের ভবিষ্যতের আহ্বান।
উৎসবের মতো পরিবেশে এগিয়ে চলে মিছিল। পৃথিবীর প্রতীক এক বিশাল রঙিন বল আর সবুজের প্রতিশ্রুতিতে ভরা একটি ব্রাজিলিয়ান পতাকায় লেখা থাকে সুরক্ষিত আমাজন। সে দৃশ্য যেন আহত বনের বুকজুড়ে জড়িয়ে দেওয়া পৃথিবীর আলতো হাত।
এ সপ্তাহের শুরুতে শুরু হওয়া এই সম্মেলনের বাইরে এটিই ছিল প্রথম বড় প্রতিবাদ। আর সেই সম্মেলনের ভেতরেও একদফা ঝড় তুলে আদিবাসী কর্মীরা আগেই ঢুকে পড়েছিলেন, দাবি তুলেছিলেন ব্রাজিলের রাষ্ট্রপতি লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার কাছে—তাদের ভূমি বাঁচাতে যেন নেওয়া হয় দৃশ্যমান পদক্ষেপ।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সাম্প্রতিক সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, তেল গ্যাস পাইপলাইন আর কয়লাখনি বিস্তারের মতো জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক প্রকল্প পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের জীবনে অন্ধকার নেমে আনার হুমকি তৈরি করছে। যেসব ভূমির ওপর এগুলোর প্রবল আঘাত এসে পড়ে, সেই ফ্রন্টলাইনে দাঁড়িয়ে থাকে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবন ও ভবিষ্যৎ।
আয়োজকদের ঘোষণায় শনিবারের এই জনসমাবেশের নাম ছিল জনগণের মহামিছিল। কপ ত্রিশ আলোচনার অর্ধেক পথ পেরোতেই জনতার শব্দ ওঠে আরও উঁচুতে।
পঞ্চাশ বছরের আদিবাসী নেতা বেনেদিতো হুনি কুইন সংবাদমাধ্যমকে বলেন, আজ আমরা আমাদের বনজীবনের হত্যাযজ্ঞ প্রত্যক্ষ করছি। তাই আমাদের কণ্ঠ যেন আমাজন থেকে প্রতিধ্বনিত হয়, আর বিশ্ব আমাদের আর্তি শোনে। তিনি বলেন, কপে বেশি সংখ্যায় আদিবাসী প্রতিনিধি দরকার, যারা আমাদের অধিকার রক্ষার ঢাল হয়ে দাঁড়াবে।
তরুণ নেতা আনা হেলোইসা আলভেস বলেন, এতো বড় জলবায়ু মিছিল তিনি আগে দেখেননি। তার চোখে এটি ছিল বিস্ময়ের উচ্ছ্বাস। এত মানুষের আর্তনাদ কেউ উপেক্ষা করতে পারবে না।
কপ ত্রিশ সম্মেলন চলছে এমন সময়ে জাতিসংঘ সতর্ক করে বলেছে, পৃথিবী খুব দ্রুত ছুঁয়ে ফেলছে দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াস উষ্ণায়নের সীমা। প্রতিশ্রুতিগুলো পূরণ হলেও এই শতকের শেষে তাপমাত্রা বাড়তে পারে দুই দশমিক তিন থেকে দুই দশমিক পাঁচ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত।
জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির প্রধান ইঙ্গার আন্দারসেন বলেছেন, দেশগুলো কিছু অগ্রগতি করলেও তা সময়ের তুলনায় খুবই ধীর। সামনে যে সংকীর্ণ জানালা বাকি আছে, সেখানে নজিরবিহীন হারে নিঃসরণ কমিয়ে আনা ছাড়া বিকল্প নেই।
এত জরুরি প্রেক্ষাপটেও বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নতুন বড় কোনো চুক্তি আসার সম্ভাবনা কম। তবু কিছু পুরোনো প্রতিশ্রুতির অগ্রগতি—বিশেষত দরিদ্র দেশগুলোর অভিযোজন তহবিল—এখনও অনেকের প্রত্যাশা জাগিয়ে রেখেছে।
আর মিছিলের স্রোতে ভেসে ওঠা সেই পতাকা, যেখানে লেখা সুরক্ষিত আমাজন, মনে করিয়ে দেয়—সবুজের বুকে যতদিন আঘাত, ততদিন থেমে থাকবে না এই পথে মানুষের হাঁটা।
















