দিল্লির কোলাহলময় এক সড়কে ভয়াবহ বিস্ফোরণ। মাত্র কয়েক সেকেন্ডে প্রাণ হারায় ১৩ জন মানুষ। অথচ এই মৃত্যুর গল্প শুরু হয়েছিল প্রায় এক মাস আগে, বহু দূরে কাশ্মীরের নওগাঁও এলাকায়।
সেই নীরব অঞ্চলের ধুলোমাখা দেওয়ালে একদিন দেখা দেয় সবুজ ছাপা অক্ষরে লেখা এক পোস্টার। ভাঙা উর্দু ভাষায় লেখা বার্তাটি ছিল পাকিস্তানভিত্তিক নিষিদ্ধ সংগঠন জইশে মুহাম্মদের নামে। বার্তায় ছিল সতর্কবাণী, হুমকি, আর বিশ্বাসঘাতকদের শাস্তির ঘোষণা।
এই পোস্টারই যেন ছুড়ে দেয় এক লুকানো অগ্নিশিখা—যা ধীরে ধীরে জ্বালিয়ে দেয় পুরো এক তদন্তযজ্ঞ, পেরিয়ে যায় কাশ্মীরের উপত্যকা থেকে উত্তর প্রদেশের জনপদ, আর শেষে এসে থামে ভারতের রাজধানীর লালকেল্লার কাছে এক রক্তাক্ত গাড়ির ভেতরে।
তদন্তকারীদের দাবি, এই অনুসন্ধানেই জড়ো হয় সূত্র, যা একাধিক তরুণ চিকিৎসকের দিকে নির্দেশ করে—তাদের মধ্যে একজন ছিলেন সেই বিস্ফোরিত গাড়ির চালক, ডাক্তার উমর নবি।
কর্তৃপক্ষ বলছে, এই ডাক্তাররা নাকি যুক্ত ছিলেন একটি “আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী চক্র”-এর সঙ্গে, যাদের যোগসূত্র মেলে জইশে মুহাম্মদ ও আনসার গজওয়াত-উল-হিন্দ নামের নিষিদ্ধ গোষ্ঠীর সঙ্গে।
কাশ্মীরে একে একে গ্রেপ্তার হয় কয়েকজন তরুণ—ইরফান আহমদ নামে এক আলেম, আদিল রাথার নামে এক চিকিৎসক, এবং ফারিদাবাদের আল-ফালাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মুজাম্মিল গনাই। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় বিস্ফোরক ও অস্ত্রের পাহাড়।
কিন্তু এই তদন্তের ছায়ায় এখন আরও এক অন্ধকার ছড়িয়ে পড়েছে ভারতে—ইসলামভীতি ও কাশ্মীরবিদ্বেষের বিষ। দিল্লি, নয়ডা ও গুরগাঁওয়ের মতো শহরগুলোতে শুরু হয়েছে কাশ্মীরি নাগরিকদের তালিকা তৈরির কাজ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উড়ছে ঘৃণার বার্তা, উচ্ছেদের হুমকি, প্রতিশোধের আহ্বান।
কাশ্মীরি ছাত্রনেতা নাসির খুহামি জানান, বর্তমানে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে প্রায় দেড় লাখ কাশ্মীরি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। বিস্ফোরণের পর থেকে তাদের মধ্যে ভয় ও অনিশ্চয়তা ঘন হয়ে উঠেছে।
উমর নবির পরিবার বলছে, সে ছিল এক প্রতিভাবান ছাত্র, একসময় চিকিৎসক হওয়ার গর্ব ছিল তাদের। এখন সেই গর্বের জায়গায় কেবল কান্না, সন্দেহ আর শোক।
আরেকদিকে গনাই পরিবারের চোখেও একই অশ্রু—“আমাদের ছেলে সারাজীবন পরিশ্রম করেছে, আমরা বিশ্বাস করতে পারছি না সে এমন কিছুর সঙ্গে জড়িত,” বলেন তার বাবা শাকিল গনাই।
ভারতের গৃহমন্ত্রী অমিত শাহ কিছুদিন আগেই দাবি করেছিলেন, কাশ্মীরে এখন ‘শূন্য নিয়োগ’ চলছে, সন্ত্রাসবাদ দমন হয়েছে সম্পূর্ণভাবে। কিন্তু সাম্প্রতিক এই ঘটনায় আবারও জেগে উঠেছে প্রশ্ন—এই নীরবতার আড়ালে কি সত্যিই শান্তি ছিল, নাকি ছিল এক গভীর, অদৃশ্য আগ্নেয়গিরি?
একটি পোস্টার থেকে শুরু—একটি বিস্ফোরণে শেষ। কিন্তু এর মাঝখানে ছড়িয়ে আছে অজস্র আতঙ্ক, তদন্ত, আর অসহিষ্ণুতার ছায়া। কাশ্মীর ও দিল্লির মাঝে এখন শুধু দূরত্ব নয়, আছে ভয় আর বিভেদের অদৃশ্য দেয়াল।
















